sponsor

sponsor

Slider

বিশ্ব

জাতীয়

রাজনীতি

খেলাধুলা

বিনোদন

ফিচার

যাবতীয় খবর

জিওগ্রাফিক্যাল

ফেসবুকে মুজিবনগর খবর

» » » কিডনি রোগ প্রতিরোধ ওপর ১৫টি ফিচার এ বিভিন্ন টিপস দেয়া হলো





কিডনি রোগ  প্রতিরোধ ওপর  ১৫টি ফিচার এ বিভিন্ন টিপস  দেয়া হলো  


কিডনি যখন নিজস্ব কোনো রোগে আক্রান্ত হয়, অথবা অন্য কোনো রোগে কিডনি আক্রান্ত হয়, যার ফলে কিডনির কার্যকরতা তিন মাস বা ততধিক সময় পর্যন্ত লোপ পেয়ে থাকে, তখন তাকে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ বলা হয়। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে যদি কিডনি রোগ ছাড়াও কিডনির কার্যকরতা লোপ পায়, তাহলেও তাকে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ বলা যেতে পারে। যেমন, ক্রনিক নেফ্রাইটিস কিডনির ফিল্টারকে আক্রমণ করে ক্রমান্বয়ে কিডনির কার্যকরতা কমিয়ে ফেলতে পারে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ হতে পারে। ঠিক তেমনি ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ কিডনি রোগ না হওয়া সত্ত্বেও কিডনির ফিল্টার/ছাঁকনি ধ্বংস করতে পারে। আবার কারও যদি জন্মগতভাবে কিডনির কার্যকরতা কম থাকে, অথবা কিডনির আকার ছোট বা বেশি বড় থাকে, তাহলেও দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ হতে পারে।

কী এই কিডনির ছাঁকনি
মানুষ জন্মগ্রহণ করার ছয় সপ্তাহের মধ্যেই কিডনির ছাঁকনি বা ফিল্টার মেমব্রেন পুরোপুরি তৈরি হয়ে যায়। অর্থাৎ কিডনি পুরোদমে কাজ শুরু করতে পারে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির প্রতিটি কিডনিতে প্রায় ১০-১২ লাখ ছাঁকনি রয়েছে এবং প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ১৭০ লিটার রক্ত পরিশোধন করে। এই পরিশোধিত রক্তের মধ্যে এক থেকে তিন লিটার শরীরের বর্জ্য পদার্থ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেওয়া হয়। সুতরাং কোনো কারণে যদি এ ধরনের ফিল্টার বাধাপ্রাপ্ত হয়, তখন দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ হতে পারে।
কিডনির কার্যকরতা যাচাই করার জন্য রক্তে ক্রিয়েটিনিন নামের জৈব পদার্থ পরিমাপ করা হয়, যার মাধ্যমে কিডনি কতটুকু কাজ করছে তা বোঝা যায়। দুঃখজনক বিষয় হলো, এই জৈব পদার্থটি ৫০ শতাংশ কিডনির কার্যকরতা নষ্ট হওয়ার পরই শরীরে বাড়তে পারে। একজন সুস্থ পুরুষ লোকের শরীরে ক্রিয়েটিনিন ১ দশমিক ৪ মিলিগ্রাম এবং একজন মহিলার শরীরে ১ দশমিক ৩ মিলিগ্রাম হিসেবে স্বাভাবিক ধরা হয়। যদি এই ক্রিয়েটিনিন পুরুষের ক্ষেত্রে ১ দশমিক ৪ মিলিগ্রামের ওপরে তিন মাস বা ততধিক কাল স্থায়ী থাকে, তখন তাকে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগী হিসেবে শনাক্ত করা হয়।

দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের জটিলতা
দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের সবচেয়ে অসুবিধা হলো, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ ধরনের রোগীর কোনো উপসর্গ হয় না। ফলে বছরের পর বছর এরা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয় না। যখন তাদের উপসর্গ দেখা দেয়, তখন তাদের কিডনির কার্যকরতা ৭৫ শতাংশ লোপ পায়। ফলে ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা করে পরিপূর্ণ সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। কিডনি যখন ক্রমান্বয়ে সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে, তখন তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে যদি দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ নিরূপণ করা যায়, তাহলে চিকিৎসার মাধ্যমে এই রোগগুলোকে আংশিক বা পরিপূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব হতো। সুতরাং কেউ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে ভুগছে কি না, এ জন্য জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি অত্যন্ত জরুরি।

দরকার নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা
শুধু সচেতনতার মাধ্যমেই একজন রোগীর কিডনিতে সমস্যা আছে কি না, তা জানা সম্ভব। যেমন, যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক লোকের উপসর্গ থাকুক বা না থাকুক, তাঁর রক্তচাপ নিয়মিত পরিমাপ করা, প্রস্রাবে অ্যালবুমিন নির্গত হচ্ছে কি না, তা জানা এবং ডায়াবেটিস আছে কি না, তা নিরূপণ করা প্রয়োজন। যদি কারও ডায়াবেটিস থাকে, তাকে অন্তত বছরে একবার প্রস্রাবে অ্যালবুমিন এবং মাইক্রো অ্যালবুমিন যাচ্ছে কি না এবং রক্তে ক্রিয়েটিনিন স্বাভাবিক কি না, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।

কিডনি রোগের ভয়াবহতা
বেশির ভাগ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের কোনো উপসর্গ হয় না। তাই এ ধরনের রোগীরা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয় না। সুতরাং দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের উপসর্গগুলো সম্পর্কে সবার ধারণা থাকা প্রয়োজন। যদিও দীর্ঘস্থায়ী কিডনি অকেজো রোগে বমি বমি ভাব, ক্ষুধামন্দা, রক্তস্বল্পতা, শরীরে পানি জমা, শ্বাসকষ্ট এবং প্রস্রাবের পরিমাণে তারতম্য, চর্মরোগ ছাড়াই শরীর চুলকানো এবং ক্রমান্বয়ে দৈনন্দিন কার্যকরতা লোপ পাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। আমাদের দেশে ৮০ শতাংশ রোগী এই উপসর্গগুলো নিয়েই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয় এবং রক্ত পরীক্ষায় দেখা যায়, কিডনির ৮০ ভাগ কার্যকরতাই তখন নষ্ট হয়ে গেছে। দীর্ঘস্থায়ী কিডনি অকেজো হওয়ার ফলে উপরিউক্ত উপসর্গ ছাড়াও শরীরে অনেক জটিলতা দেখা দেয়। তার মধ্যে প্রধান হলো হূৎপিণ্ডের রোগ।

কিছু সমীক্ষা…
বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে, যারা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি অকেজো রোগে ভোগে, তাদের হূৎপিণ্ডে রোগের আশঙ্কা ১০ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশও ছাড়িয়ে যেতে পারে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি অকেজো রোগীরা ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে, ২৫ শতাংশ হার্ট স্ট্রোকে এবং ২০ শতাংশ হার্ট ফেইলিওর রোগে ভুগে থাকে। ৭৫ শতাংশের হূৎপিণ্ডের প্রকোষ্ঠ বড় হয়ে যায় এবং ছয় শতাংশের ক্ষেত্রে ব্রেইন স্ট্রোকের প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। আর ডায়াবেটিসজনিত কিডনি রোগের কারণে উপরিউক্ত হার আরও বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া কিডনি অকেজো রোগীরা সর্বদাই রক্তস্বল্পতায় ভুগে থাকে, যা পরবর্তীকালে হূৎপিণ্ডের প্রকোষ্ঠের আকার বড় করে হার্ট ফেইলিওর করতে পারে। এ ছাড়া এদের রক্তে চর্বিতে ভারসাম্য থাকে না এবং ভিটামিন ‘ডি’-এর অভাব হয়।

দেশে এক কোটি ৮০ লাখ কিডনি রোগী
বাংলাদেশে কিডনি ফাউন্ডেশন ও বিএসএমএমইউয়ের উদ্যোগে সাভারের চাকুলিয়া গ্রামে তিন বছর ধরে কতজনের দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ রয়েছে, তার ওপর গবেষণা চালানো হচ্ছে। তিন হাজার প্রাপ্তবয়স্ক লোকের ওপর চালানো এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ১৮ শতাংশ মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত। এদের মধ্যে ১৩ শতাংশ রোগীর রক্তে ক্রিয়েটিনিন স্বাভাবিকের চেয়ে ওপরে অর্থাতৎ তাদের কিডনির কার্যকরতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৩ সালে ১৫ হাজার ৬২৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের ওপর সমীক্ষায় দেখা যায়, এদের ১১ শতাংশ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত। অস্ট্রেলিয়ায় এই সংখ্যা ১৬ শতাংশ এবং আইসল্যান্ডে ১০ শতাংশ। এই সমীক্ষা থেকে এটা প্রতীয়মান হয়, বর্তমানে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ লোক দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে ভুগছে।

প্রতিবছর মারা যায় ৪০ হাজার
বিভিন্ন হাসপাতালের পরিসংখ্যান থেকে এটা ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার রোগী কিডনি সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে মারা যায়। এই ঊর্ধ্বহারে কিডনি অকেজো হওয়ার কারণ হিসেবে নেফ্রাইটিস, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপকেই দায়ী করা হয়ে থাকে। নেফ্রাইটিস রোগের প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার জন্য ব্যাকটেরিয়াজনিত ইনফেকশন, ভাইরাল হেপাটাইটিস, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর ও ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াকে দায়ী করা হয়। খাবারে রাসায়নিক পদার্থ মেশানো ও ভেজাল, ক্রনিক ইন্টারস্টেশিয়াল নেফ্রাইটিসকে এর কারণ হিসেবে দায়ী করা যেতে পারে। এমনকি পানিতে অধিক পরিমাণে আর্সেনিক কিডনি রোগের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিতে পারে। মার্কারি, লেড, গোল্ড ও অন্যান্য ধাতব পদার্থ কিডনি রোগের কারণ হতে পারে। হেপাটাইটিস ‘বি’ এবং ‘সি’ ভাইরাস এইচআইভি ভাইরাস দক্ষিণ আফ্রিকাতে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের একটি বড় কারণ। ঠিক তেমনি ম্যালেরিয়া আফ্রিকা মহাদেশে কিডনি রোগের কারণ হিসেবে বিবেচিত।

কিডনি অকেজো রোগীর চিকিৎসা
কিডনি সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গেলে শুধু ওষুধের মাধ্যমে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন হয় নিয়মিত ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি সংযোজন। বর্তমান বিশ্বে নিয়মিত ডায়ালাইসিস করে একজন রোগী পাঁচ থেকে ১৫ বছর এবং সফল কিডনি সংযোজনের মাধ্যমে ১০-১৫ বছর স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। পৃথিবীতে নিয়মিত হেমোডায়ালাইসিসের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৩০ বছর পর্যন্ত রোগী বেঁচে আছে এবং সফল কিডনি সংযোজনের ক্ষেত্রে প্রায় ৩৩ বছর বেঁচে থাকার রেকর্ড রয়েছে। (নিয়মিত ডায়ালাইসিস বলতে সপ্তাহে তিনবার চার ঘণ্টা করে হেমোডায়ালাইসিস মেশিনের মাধ্যমে চিকিৎসা করা বোঝায়।) ঠিক তেমনি নিকটাত্মীয়ের কিডনি নিয়ে প্রতিস্থাপনকে কিডনি সংযোজন বোঝায়। অবশ্য উন্নত বিশ্বে মৃত ব্যক্তির কিডনি নিয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কিডনি সংযোজন করা হয়ে থাকে।

কিডনি রোগ শনাক্ত করা দরকার
বর্তমানে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ কীভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব, তা নিয়ে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। গ্রাম ও শহর পর্যায়ে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ শনাক্ত করে তা চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে গ্রাম পর্যায়ের চলমান গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৮ শতাংশ, যাদের মধ্যে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশেরই উচ্চ রক্তচাপ, পাঁচ শতাংশ ডায়াবেটিস এবং ছয় শতাংশের প্রস্রাবে প্রোটিন নির্গত হয়। উল্লিখিত পাঁচ শতাংশ ডায়াবেটিক রোগীর ৩০ শতাংশ এবং ১৮ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপের ১৫ শতাংশ এবং প্রস্রাবে প্রোটিন নির্গত হওয়া ছয় শতাংশ রোগী—সবাই দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়। ওই সমীক্ষায় রোগীদের প্রশ্ন রাখা হয়েছিল, তারা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও প্রস্রাবে প্রোটিন নির্গত হওয়া সম্পর্কে জানে কি না। শতকরা ৬০ শতাংশ রোগী জানেই না যে তাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ অথবা প্রস্রাবে প্রোটিন নির্গত হয় এবং তারা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়নি। সুতরাং এই রোগীরাই দীর্ঘস্থায়ী কিডনি অকেজো রোগে ভোগে এবং ক্রমান্বয়ে সম্পূর্ণভাবে কিডনি বিনষ্ট হয়। এই রোগীদেরই শনাক্ত করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা উচিত।

কিডনি রোগ প্রতিরোধের উপায়
এটা পরীক্ষিত যে, এসিই-ইনহ্যাবিটরস এবং এআরবিজাতীয় উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ কিডনি রোগ প্রতিরোধে খুবই কার্যকর। ঠিক তেমনি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা মাইক্রো-অ্যালবুমিন ধরা পড়লে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা করা প্রয়োজন। এ ছাড়া নিয়মিত ব্যায়াম, ফাস্টফুড না খাওয়া, চর্বিজাতীয় খাবারের প্রতি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা গেলে কিডনি রোগ প্রতিরোধ সম্ভব। এ ছাড়া ক্ষেত্রবিশেষে চর্বি নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ খেলে, ধূমপান না করলে কিডনি রোগ প্রতিরোধ করা যায় এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত হূদরোগ থেকেও রেহাই পাওয়া যায়।
কিডনি রোগীদের সচেতন করে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগ শনাক্তকরণের সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে লাখ লাখ কিডনি রোগীর কিডনি সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়া থেকে অনেকাংশে রক্ষা পাবে। পাশাপাশি কিডনি অকেজো রোগীরা ডায়ালাইসিস ও কিডনি সংযোজনের বিশাল খরচ থেকে মুক্তি পাবে।




রণোত্তর কিডনি সংযোজন জরুরি


বাংলাদেশে হাজার হাজার মানুষ লিভার, কিডনি, ফুসফুস অকেজো হয়ে মৃত্যুবরণ করে। এ ছাড়া প্রতিবছর প্রায় এক কোটি লোক কোনো না কোনোভাবে কিডনির রোগে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে বছরে প্রায় ৪০ হাজার রোগী সম্পূর্ণ কিডনি-বিকলতায় মারা যায়। যে হারে কিডনি-অকেজো রোগী বাড়ছে সে হারে নিকটাত্মীয়ের মধ্যে দাতা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে হাজার হাজার রোগী অকালে মৃত্যুবরণ করছে। উন্নত বিশ্বে কিডনি রোগীদের শতকরা ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ কিডনি প্রতিস্থাপিত হয় মৃতপ্রায় ব্যক্তির কিডনি সংযোজনের মাধ্যমে। একে বলে ক্যাডাভারিক কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশন। এ ব্যবস্থায় সফলতার হার শতকরা ৮৫ থেকে ৯০ ভাগ। দেশে ক্যাডাভারিক বা মরণোত্তর কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট ব্যবস্থা চালু হলে অন্তত বিপুলসংখ্যক রোগীর দাতাসংকটের সমাধান হবে। এ ক্ষেত্রে রোগীদের উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগ করে সুস্থ্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। কিডনি-অকেজো রোগীদের দেহে প্রতিস্থাপনে এ জন্য দেশেই চালু হওয়া দরকার ডিসিস্ট বা ক্যাডাভারিক কিডনি সংযোজন ব্যবস্থা। এটা এখন সময়ের দাবি।

ক্যাডাভারিক কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট
যখন মৃতপ্রায় ব্যাক্তির দেহ থেকে কিডনি নিয়ে জীবিত কোনো কিডনি-অকেজো রোগীর দেহে প্রতিস্থাপন করা হয় তখন তাকে ক্যাডাভারিক কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশন বলা হয়। এ জন্য যে হাসপাতালে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হবে, সে হাসপাতালে একটি ব্রেইন ডেথ কমিটি ও একটি অরগান প্রকিউরমেন্ট কমিটি থাকবে। ব্রেইন ডেথ কমিটিতে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল থাকবে। আর অরগান প্রকিউরমেন্ট কমিটিতে একজন সার্জন, একজন টিস্যু টাইপিং স্পেশালিস্ট, একজন সোশ্যাল ওয়ার্কার থাকবেন। সোশ্যাল ওয়ার্কারের কাজ হবে আইসিইউতে কোনো রোগীর ব্রেইন ডেথ হওয়ার পর রোগীর নিকটাত্মীয়কে অঙ্গদানে উদ্বুদ্ধ করা। তখন তাঁরা সম্মত হলে রক্তের গ্রুপ, এইচএলএ টাইপিং ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে নেওয়া হয়। এরপর কিডনি-অকেজো রোগী, যাঁরা প্রতিস্থাপন করতে আগ্রহী, তাঁদের সঙ্গে রক্তের গ্রুপ ও টিস্যু টাইপিংয়ের মিল বের করে সংগৃহীত কিডনিকে জীবনরক্ষাকারী মেশিনের দ্বারা কার্যক্ষম রাখা হয়। এ অবস্থ্থায় মৃত ব্যক্তির কিডনি নিয়ে বরফের ভেতর রেখে তিন থেকে ১৮ ঘণ্টার মধ্যে সংযোজনের ব্যবস্থ্থা করা হয়ে থাকে।

একসঙ্গে বাঁচতে পারে পাঁচজন
দেশে নানা দুর্ঘটনায় প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। ক্যাডাভারিক বা মৃত লোকের কিডনি সংযোজনের ব্যবস্থা চালু হলে তাৎক্ষণিক সেসব মৃতপ্রায় লোকদের কাছ থেকে কিডনিসহ দরকারি অরর্গানগুলো বিযুক্ত করে হাজার হাজার মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব। মরণোত্তর কিডনি সংযোজনে আইনানুগ বা ধর্মীয় কোনো জটিলতাও নেই। কিডনির মতো হার্ট, লিভার ফেইলিওর রোগীর সংখ্যাও দেশে অগণিত। ক্যাডাভারিক পদ্ধতিতে শুধু কিডনি নয়, একই অবস্থায় অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে। একজন মৃত ব্যক্তি পারে একসঙ্গে পাঁচজন রোগীকে বাঁচাতে। প্রথমত, তার দুটি কিডনি দুজন, একটি লিভার একজনের দেহে, একটি ফুসফুস একজনের দেহে, একটি হার্ট একজনের দেহে প্রতিস্থাপন করে ভিন্ন পাঁচজন রোগীকে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব। এ জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ‘ব্রেইন ডেথ কমিটি’ গঠন এবং একটি পূর্ণাঙ্গ ‘অরগান প্রকিউরমেন্ট কমিটি’ গঠন করা আবশ্যক। যে কমিটির কাজ হবে ব্রেইন ডেথ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর নিকটাত্মীয়কে অঙ্গদানে সম্মত করা এবং তারা মত দিলেই অরগান প্রকিউরের পর তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে তা উপযুক্ত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া। এ পদ্ধতি কার্যকর করা গেলে বাংলাদেশে হাজার হাজার কিডনি-অকেজো রোগীসহ অন্য রোগীরা নতুন জীবন ফিরে পেতে পারে। এতে একসঙ্গে পাঁচজন রোগীকে বাঁচানো যেতে পারে।

মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন বিধান আইন
বাংলাদেশের শুধু ঢাকাতেই সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রায় ১০টিরও বেশি আইসিইউতে ১০০টির মতো বিছানা রয়েছে। এখানে নানা দুর্ঘটনা, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণসহ বহু রোগী ভর্তি হয়ে থাকে। এসব রোগীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে কিডনি, ফুসফুস, হার্ট, লিভার প্রভৃতি অঙ্গ পাঁচ থেকে ২০ ঘণ্টা সংরক্ষণ করা গেলেই তা অকেজো অঙ্গের দেহে প্রতিস্থাপন সম্ভব। এতে হাজার হাজার রোগীর দাতাসংকটের সমাধা হওয়ার পাশপাশি এসব কিডনি-অকেজো রোগীকে নতুন জীবন দান করা সম্ভব।


কিডনি রোগীর পথ্য ও পুষ্টি


আমাদের দেশে দিনে দিনে কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এর মধ্যে ক্রনিক কিডনি রোগী ও শিশু কিডনি রোগী সর্বাধিক। এর কিছু সাধারণ কারণ হলো: ১. খাদ্যে ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্য ২. বাহিরের খাবারের প্রতি আগ্রহ ও খাদ্য গ্রহণ বৃদ্ধি ৩. প্রত্যেক স্কুলের সামনে অস্বাস্থ্যকর খোলা খাবার বিক্রয় ৪. ডায়াবেটিস ৫. উচ্চ রক্তচাপ ৬. শরীরে অতিরিক্ত ওজন ৭. প্রস্রাবে এলবুমিন নির্গত হওয়া ৮. কিছু কিছু ক্ষেত্রে জেনেটিক ও বংশগত কারণও দায়ী করা হয়। এর মধ্যে অনেক রোগের অন্যতম কারণ হলো নিজের প্রতি নিজের অসচেতনতা, অযত্ন। নিজেকেই নিজের যত্ন নিতে হবে। এক জন মানুষের প্রথম চিকিৎসক সে নিজেই নিজের একটুখানি সচেতনতা। তাকে অনেক রোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করবে। “কথায় বলে” ঢ়ৎবৎবহ ভরফৎ রং নবঃবৎ ঃযবহ পবৎবব অর্থাৎ নিরাময়ের চেয়ে প্রতিকার ভালো। ব্যাক্তি সচেতনতা দিতে পারে নিরোগ শরীর। আর নিরোগ শরীরের জন্য চিকিৎসার কোন প্রয়োজন নেই। আমরা প্রত্যেকে যদি নিজে কেবলমাত্র নিজের দায়িত্ব নেই তবে রোগ প্রতিরোধ সম্ভব। কিছু নিয়ম-নীতি মেনে চললে অর্জন হবে সুস্বাস্থ্য, বেচে যাবে বিপুল পরিমাণ চিকিৎসা খাতের খরচ।

সাধারণ নিয়ম-নীতিগুলো হলো: ১. নিয়মিত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা, প্রতিদিন গোসল করা ও খাবার আগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া। ২. স্বাস্থ্যকর সুষম খাবার গ্রহণ করতে হবে। বাসী, পচাঁ খাবার ত্যাগ, অসচেতনতার দরুন বাসী পচাঁ খাবার থেকে ডায়রিয়া, আমাশয় এমনকি দির্ঘদিনের অভ্যাস থেকে কিডনি অকেজো হতে পারে। ৩. শরীরের আদর্শ ওজন বজায় রাখা। স্থূল শরীর বা অতিরিক্ত ওজন সমস- রোগের সম্ভাবনাকে বাড়ায়, যেমন: ডায়াবেটিস, উচ্চরক্ত চাপ এরা উভয়ে মিলে আক্রমণ করে কিডনির উপর। ৪.শুয়ে বসে দিন পার না করে স্বাভাবিক হাঁটাচলা, কাজকর্ম বজায় রাখা, নিয়মিত স্বাভাবিক ব্যায়াম করুন অথবা হাটুন। ৫. রক্তে চিনির স্বাভাবিক মাত্রার উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা এবং নিয়মিত পরীক্ষা করা। ৬. নিয়মিত রক্তচাপ (ব্লাডপ্রেসার) পরীক্ষা করা। স্বাভাবিক রক্তচাপ ১২০/৮০। ৭. খাদ্যাভ্যাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ, প্রত্যেককে জানতে হবে সুস্থ্য নিরোগ আদর্শ ওজনের শরীরের জন্য কোন খাবার খাবো, কোন খাবার কম খাবো, কোন খাবার পরিহার করবো। কোন খাবার কি পরিমাণে খাবো। উদাহরণ: একজন কিডনি রোগী যার সিরাম ক্রিয়েটিনিন ৪০০ এর উপরে এবং সিরাম পটাসিয়াম ৫.৩ সে শারীরিক দুর্বলতার কারণে পর পর দুই দিন ইচ্ছামত মুরগীর স্যুপ এবং প্রচুর ফল খায়, ৩য় দিন তার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় সে হাসপাতালে ভর্তি হয়। তার ধারণা ছিল উক্ত খাবার তার দুর্বলতা কাটাবে, সে স্বাভাবিক সুস্থ্যতা ফিরে পাবে। অথচ উক্ত খাবার উক্ত রোগীর জন্য বর্জনীয়। সে পরিমিত প্রোটিন (অর্থাৎ মুরগী), ফল (পটাসিয়াম সমৃদ্ধ) একে বারেই বর্জনীয়। প্রত্যেককে খাদ্য সমন্ধে সচেতন হতে হবে, পুষ্টিজ্ঞান অত্যন- প্রয়োজন।

বিশেষ কিছু রোগের খাদ্য নির্বাচন যেমন: (ক) ডায়াবেটিক (খ) উচ্চরক্ত চাপ (গ) কিডনী রোগ (ঘ) হৃদরোগ (ঙ) অতিরিক্ত ওজন কিডনী রোগীর বেলায়। ৮. প্রচুর পানি পান করুন। এ কথাটি মোটেও প্রযোজ্য নয়। বিশেষ করে কিডনি রোগের বেলায়। কারণ মূত্রত্যাগ এর পরিমানের উপর নির্ভর করে কতটুকু পানি পান করবেন। প্রচুর কথাটির নিদির্ষ্ট কোন মাপ নেই। তাই কিডনি রোগীকে বিশেষ সতর্ক হতে হবে পানি গ্রহনের ব্যাপারে। এ ব্যাপারে আপনার ডাক্তার অথবা ডাইটিশিয়ান অথবা স্বাস্থ্যকর্মির পরামর্শ নিন। উদাহরণ: কোন কোন কিডনি রোগীকে ৫০০ সষ পানি (২৪ ঘন্টায়) পান করার উপদেশ দেয়া হয়। তার শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে। ৯. লবণ গ্রহণ: অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ কিডনি রোগকে তরান্বিত করে। প্রতিদিন রান্নায় ১ চা চামচ লবণ গ্রহণ করুন, এতে আপনার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। সংযত থাকুন: আচার, পনির, চিপস, লোনামাছ, শুটকি এবং সালাদ ও টকফল এর সাথে লবণ খাওয়া থেকে। ১০. ধূমপান ছেড়ে দিন। নতুবা এটি আপনাকে ছাড়বে না। উদাহারণ: একজন ৮০ বছর বয়স্ক বৃদ্ধা ফুসফুসের ক্যান্সার নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি। তার বিবরণী থেকে জানা গেল সে ২০ বছর বয়স থেকে সিগারেট টানা শুরু করছে, ৩০ বছর ক্রমাগত সিগারেট খেয়েছেন এবং ৩০ বছর ধরে খাচ্ছেন না = ৮০ বছর বয়সের হিসাব। বর্তমানে ৮০ বছর বয়সে ফুসফুসের ক্যান্সার। চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এখনই আপনি সিদ্ধান- নিন এখনই সচেতন হোন। ১১. খুব বেশী ওষুধ গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। একটুতেই ওষুধ মুখে নেবেন না। আপনার কিডনি ক্রমাগত উপকারী পুষ্টি ছেকে শরীরে ধরে রাখছে এবং অপ্রয়োজনীয় বর্জপদার্থ বের করে দিচ্ছে। আর স্বাভাবিক কাজে তাকে সাহায্য করুন। ১২. শক্তিবর্ধক ভিটামিন টেবলেট খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। এটি ধীরে ধীরে আপনার কিডনি অকেজো করে দেয়। মনে রাখবেন আপনি যদি নিয়মিত সুষম খাবার (ইধষধহপব উরবঃ) গ্রহণ করেন তবে কোন কৃত্রিম ভিটামিনের প্রয়োজন নেই। সাময়িক স্বসি-র কাছে স্থায়ী কিডনি অকেজো সীমাহীন দুর্ভোগ নিজেই নিজের কিডনি অকেজো করবেন না। কিডনি রোগ অত্যন- যন্ত্রনাদায়ক, অত্যন- ব্যায়বহুল এবং বছরে ৪০ হাজার রোগী মারা যায়। আক্রান-দের মধ্যে ৯০ ভাগের পক্ষে এই ব্যায়বহুল চিকিৎসা করা সম্ভব হয় না। ১৩. ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ হতে দুরে থাকুন। আমাদের দেশে ৫১ ভাগ লোকই জানে না তাদের ডায়াবেটিস এবং ৩৫ ভাগ লোকই জানে না তাদের উচ্চ রক্তচাপ। এই অজানা একত্রিত হয়ে জন্ম দেয় নতুন বন্ধু- সেটি হলো কিডনি অকেজো, উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকার দরুন তাদের এই ভয়াবহ ফলাফল। একটু ব্যক্তিগত সচেতনতা এনে দিতে পারে অপরিসীম স্বস্থি, সাচ্ছন্দ্য। নিম্নে একজন কিডনি রোগের পথ্য ও অনে-র ব্যাপারে সাধারণ ধারণা দেয়া হলো: কিডনি রোগ সনাক্ত হবার সাথে সাথে ৩০ মস প্রোটিন প্রগণ করতে হবে এ ধারনা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীণ। প্রোটিন গ্রহনের পরিমাপ নির্ভর করবে তার রক্তের ক্রিয়েটিনিনের মাত্রার উপর। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক সুস্থ ব্যাক্তির প্রতি কেজি দৈহিক ওজনের জন্য ১ গ্রাম প্রোটিন নির্ধারণ করা হয়। কিডনী রোগে আক্রান- ব্যাক্তির জন্য (০.৫ গ্রাম থেকে ০.৮ গ্রাম) প্রতি কেজি দৈহিক ওজনের জন্য নির্ধারণ করা হয়। সবচেয়ে গুরুতর অবস্থায় ৩০ কেজি ওজনের একজন রোগীর ০.৫ গ্রাম/কেজি প্রোটিন নির্ধারণ হয়। সেই হিসাবে (৩০ ী ০.৫) = ৩০ গ্রাম প্রোটিন। মনে রাখতে হবে কিডনি রোগীকে উচ্চ জৈব মূল্যের প্রানিজ প্রোটিন দিতে হবে। যেমন-মাছ, মাংস, ডিম, দই ইত্যাদি। এবং সঠিক হিসেব রাখতে হবে। ৩০ গ্রাম মাছ/মাংসের টুকরা মানে ৩০ গ্রাম প্রোটিন নয়, ৩০ গ্রাম টুকরা থেকে মাত্র ৭ গ্রাম প্রোটিন পাওয়া যাবে। অনেকে ১ টুকরার বেশী মাছ/মাংস খেতে চান না। ৩০ গ্রাম প্রোটিন পূরনের জন্য : ১ টুকরা মাছ (৩০ মস) = ৭ মস প্রোটিন, ১ টুকরা মুরগী (৩০ মস)= ৭ গ্রাম প্রোটিন, ১টি ডিমের সাদাঅংশ = ৪ গ্রাম প্রোটিন, ১ কাপ টক দই = ৬ গ্রাম প্রোটিন মোট= ২৪ গ্রাম প্রোটিন। বাকীটুকু ভাত, রুটি ও সবজি থেকে পাওয়া যায়। কিডনি রোগীর দিনে দিনে ওজন কমতে থাকে। এদিকে খেয়াল রেখে খাদ্য তালিকা তৈরী করতে হবে। তার খাবার সীমিত প্রোটিন ও যথাযথ ক্যালরী সমৃদ্ধ হবে বিশেষ ভাবে খেয়াল রাখতে হবে:

(১) কিডনি রোগী মাছ, মাংস, দুধ, ডিম সিমীত পরিমানে খাবেন। এগুলো প্রাণিজ প্রোটিন। (২) উদ্ভিজ প্রোটিন বা দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রোটিন যেমন-ডাল, মটরশুটি, সিমেরবীচি যে কোন বীচি জবহধষ উরবঃ-এ থাকবে না। (৩) যে সমস- সবজি খাবেননা: ফুলকপি, বাধাকপি, গাজর, ঢেঁড়শ, শীম বরবার্ট, কাঠালের বীচি, শীমের বীচি, মিষ্টি কুমড়ার বীচি, কচু, মূলা এবং পালং, পুই ও মূলা শাক খাওয়া যাবে না। (৪) যে সমস- সবজি খাবেন: লাউ, জিংগা, চিচিঙ্গা, ডাটা, করলা, পটল, পেঁপে, ধূন্ধল, শশা (বীচি ছাড়া) সাজনা ইত্যাদি, সাকের মধ্যে ডাটা, লালশাক, কমলি, হেলেঞ্চা, কচু শাক খাওয়া যাবে। (৫) ডাল এবং ডাব একেবারেই খাওয়া চলবে না। কারণ কিডনি রোগীদের রক্তে পটাশিয়াম এর মাত্রা বাড়তে থাকে। কম পটাশিয়াম সমৃদ্ধ সবজি বেছে নিন। পটাশিয়ামের মাত্রা স্বাভাবিক হলো (৩.৫-৫.২) সড়ষ/ষ এর বেশী হলে খাদ্য তালিকায় ফল রাখা যাবে না। পটাশিয়ামের মাত্রা স্বাভাবিকের মধ্যে থাকলেও কিডনী রোগীরা কম পটাশিয়াম যুক্ত ফল বেছে নিন যেমন:- আপেল, পেয়ারা, পাকা পেঁপে, নাসপাতি, সবজির পটাশিয়ামের মাত্রা কমানোর জন্য সবজি রান্নার পূর্বে ভালো করে ধুয়ে নিন। ভারি করে কাটুন। প্রথমে সবজি সেদ্ধ করে পানি ফেলে দিন। তারপর রান্না করুন। (৬) অন্যান্য যে সমস- খাবার বাদ দিতে হবে তা হলো, টিনের খাবার, শুটকী মাছ, বাদাম, আচার, চাটঁনী, সস ইত্যাদি।

রক্তে ক্রিয়েটিনিন সম্পর্কে ধারনা: রক্তে ক্রিয়েটিনিনের স্বাভাবিক পরিমাপ হলো ৫৩-১২৩ মাইক্রোমোল/লিটার এর বেশী হলে আপনাকে সতর্ক হতে হবে। অনতি বিলম্বে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করুন। ক্রিয়েটিনিন ও প্রোটিন গ্রহন: রক্তে ক্রিয়েটিনিনের পরিমাপ: ৩০০ মাইক্রোমোল/লিটার হলে ৩০ গ্রাম প্রোটিন, ২৫০-৬০০ মাইক্রোমোল/লিটার হলে ৪০ গ্রাম প্রোটিন, ১৪০-২৫০ মাইক্রোমোল/লিটার হলে ৫০ গ্রাম প্রোটিন এর কিছুটা কম বা বেশী হতে পারে। এটি নির্ধারন করবে আপনার পুষ্টিবিদ।

একজন কিডনি রোগীর নিম্নের অবস্থার উপর নির্ভর করবে সে কি ধরনের পথ্য গ্রহণ করবে: (১) কিডনি রোগের প্রকার (২) কিডনি রোগের ধাপ (৩) রোগী ডায়ালাইসিস শুরু করেছেন কি না (৪) ডায়াবেটিস আছে কিনা (৫) রোগীর ওজন উচ্চতর কি না ও বয়স বিশ্লেষণে (৬) শারীরিক পরিশ্রম (৭) প্রস্রাব নির্গমনের পরিমাপ (৮) রক্ত পরীক্ষার ফলাফল, কিডনি রোগীকে বিশেষ ভাবে মনে রাখতে হবে, প্রত্যেক রোগীর পথ্য তালিকা ভিন্ন হবে, উপরোক্ত অবস্থার বিশ্লেষনে এবং পথ্য ব্যাবস্থাপনা আপনার চিকিৎসার অত্যন- গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পথ্য আপনার কিডনি রোগ নিরাময় করবে না। পথ্য কিডনি রোগ নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। এতে আপনি হয়তো যন্ত্রণার পরিবর্তে



কিডনি সংযোজন ও একটি মানবিক আবেদন


সাব্বির ও শাহেদ (ছদ্ম নাম) দুই যমজ ভাই। দুই ভাই-ই শেষ পর্যায় দীর্ঘস্থায়ী কিডনি অকেজো রোগে আক্রান্ত। বিধবা মায়ের চোখের মণি দুই ভাই ডায়ালাইসিস চিকিত্সার মাধ্যমে কোনোমতে বেঁচে আছে। অথচ কিডনি সংযোজনের মাধ্যমে দু্ই ভাই নতুন জীবন ফিরে পেতে পারে। এখন প্রশ্ন, এই কিডনি দেবে কে?
বর্তমানে পৃথিবীতে কিডনি রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এ রোগে আক্রান্তের হার খুব বেশি। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় দুই কোটি লোক কোনো না কোনো কিডনি রোগে ভুগছে। প্রতি মিলিয়নে ১২০ থেকে ১৫০ জন মানুষ শেষ পর্যায়ে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি অকেজো রোগে আক্রান্ত হয় এবং প্রতিবছর এ রোগে মৃত্যুবরণ করে প্রায় ৩৫ হাজার লোক। গত ১০ বছরে কিডনি রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় এক কোটি। সমস্যা হলো, তাদের মধ্যে অধিকাংশ লোকই জানে না সে কিডনি রোগে ভুগছে এবং যখন কিডনি রোগ শারীরিক সমস্যা তৈরি করে, তখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ডায়ালাইসিস বা কিডনি সংযোজন ব্যতীত অন্য কোনো উপায় থাকে না।
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনির প্রদাহ—এ তিনটিই ক্রনিক কিডনি বা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি অকেজো রোগের মূল কারণ। সাম্প্রতিককালে এক সমীক্ষায় দেখা যায় যে বাংলাদেশে প্রায় ১৭ শতাংশ লোক ক্রনিক কিডনি রোগে আক্রান্ত, অস্ট্রেলিয়ায় এ হার ১৬ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১১ শতাংশ। ক্রনিক কিডনি ডিজিজ বা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি অকেজো রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীর সমান বা বেশি। তবে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কার ব্যাপার এই যে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ দুটিই আবার দীর্ঘস্থায়ী কিডনি অকেজো রোগের অন্যতম কারণ। ফলে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি অকেজো রোগ জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ বলে বিবেচিত।
আমরা যদি নিয়মিত রক্তচাপ মাপি এবং ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগের জন্য রক্ত পরীক্ষা করি, তবে শুরুতেই কিডনি রোগ শনাক্ত করা সম্ভব। প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনি রোগ ধরা পড়লে এবং উপযুক্ত চিকিত্সা দিলে কিডনি অকেজো রোগে আক্রান্তের সংখ্যা কমানো সম্ভব। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে, এমনকি শহরেও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৯০ শতাংশ লোকেরই রক্তচাপ সব সময় নিয়ন্ত্রণে থাকে না। একই অবস্থা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রেও, যা খুবই ভয়ংকর, অথচ শুধু ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে আমরা কিডনি রোগ বহুলাংশে প্রতিরোধ করতে পারি।
এ তো গেল প্রতিরোধের কথা। আর শেষ পর্যায় দীর্ঘস্থায়ী কিডনি অকেজো রোগের মূল চিকিৎসা হলো ডায়ালাইসিস বা কিডনি সংযোজন। ডায়ালাইসিস চিকিৎসা ব্যয়বহুল এবং যন্ত্রনির্ভর, যাতে বছরে খরচ হয় প্রায় তিন থেকে চার লাখ টাকা। অপরদিকে সরকারি হাসপাতালে কিডনি সংযোজনে খরচ পড়ে দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টাকা। তারপর প্রতিবছর ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা ওষুধ বাবদ খরচ হয়। সত্যিকারভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, কিডনি সংযোজনই শেষ পর্যায় দীর্ঘস্থায়ী কিডনি অকেজো রোগের আদর্শ চিকিৎসা। ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে কখনোই কিডনির সব কাজ সম্ভব নয়, শুধু একটি কিডনিই করতে পারে আরেকটি কিডনির কাজ।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে বাংলাদেশে কিডনি সংযোজনের হার খুবই কম। যদিও নয়টি হাসপাতালে কিডনি সংযোজন করা যায়। বর্তমানে শুধু জীবিত ব্যক্তি তার নিকটাত্মীয়কে কিডনি দান করছে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি তার মৃত্যুর পর কিডনি দান করতে আগ্রহ প্রকাশ করেনি বলে এখনো মৃত ব্যক্তি থেকে কিডনি সংযোজনের প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। মানুষের মধ্যে অঙ্গ দান করার ব্যাপারে সচেতনতার অভাব আছে। একটি কিডনির অভাবে যেমন কিডনি অকেজো রোগী ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তেমনি কতিপয় দালাল কিডনি বিক্রির ব্যবসায়ে অসুস্থ রোগীকে প্রলুব্ধ করছে। এই অসাধু ব্যবসা বন্ধ ও অঙ্গ সংযোজন প্রক্রিয়া গতিশীল করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সংসদ ১৯৯৯ সালে মানব দেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, ১৯৯৯ পাস করে। এ আইনে সুনির্দিষ্টভাবে অঙ্গ দানকারীর সংজ্ঞা, গ্রহীতার সংজ্ঞা, ব্রেইন ডেথ ঘোষণা, নিকটাত্মীয়ের সংজ্ঞা, উত্তরাধিকারীর সংজ্ঞা এবং এ আইন অমান্যকারীর জন্য শাস্তির বিধান বর্ণিত আছে। ১৮ বছর বা তার অধিক বয়সের যেকোনো সুস্থ বা সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় তার নিকটাত্মীয়ের (ছেলেমেয়ে, মা-বাবা, ভাইবোন ও রক্ত-সম্পর্কিত আপন চাচা, ফুফু, মামা, খালা ও স্বামী-স্ত্রী) দেহে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজনের জন্য দান করতে পারবেন। এই নিকটাত্মীয়ের সম্পর্ক ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় অঙ্গ দান করতে পারবেন না। কিন্তু মৃত্যুর পর যে কেউ যেকোনো ব্যক্তিকে অঙ্গ দান করতে পারবেন। মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় বা তার বিনিময়ে কোনো সুবিধা লাভ বা এই উদ্দেশ্যে কোনো প্রকার বিজ্ঞাপন প্রদান বা অন্য কোনোরূপ প্রচারণা এই আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ আছে। এই আইনের লঙ্ঘন করলে বা লঙ্ঘনে সহায়তা করলে তিন থেকে সাত বছরের জেল বা অর্থদণ্ড বা উভয় প্রকার দণ্ডের বিধান আছে।
লেখার শুরুতে যে দুই সহোদরের সমস্যার কথা বলেছি, তার সমাধান মূলত লুকিয়ে আছে মানুষের সচেতনতার মধ্যে। তাদের নিকটাত্মীয় কিডনি দান করলেই তাদের জীবনে প্রাণ ফিরে পেতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, নিকটাত্মীয়ের মধ্যে কেউ কিডনি দেওয়ার জন্য উপযুক্ত নয় আর যারা উপযুক্ত তারা কিডনি দিতে ইচ্ছুক নয়। এখানে উল্লেখ্য, প্রতিটি ধর্মেই অঙ্গ দান করার ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা আছে। অধিকন্তু কিডনি দান করার পরে কিডনি দানকারী সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। এখন প্রয়োজন আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
আমরা যদি একটু সচেতন হই, তবে একজন মানুষ তার মৃত্যুর পর কমপক্ষে ১০ জন মানুষকে নতুন জীবন দিতে পারে। এই সচেতনতার ব্যাপারে মিডিয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
সরকার দেশে একটি অঙ্গ সংযোজন নেটওয়ার্ক কার্যক্রম শুরু করতে পারে, যার মাধ্যমে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান ও সংযোজন কার্যক্রম পরিচালিত হবে এবং সেই সঙ্গে সময়ের প্রয়োজনে মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইনের পরিবর্তন বা


কিডনি রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিস্থাপন: বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত

যাঁরা অংশ নিলেন
 অধ্যাপক হারুন অর রশীদ
প্রেসিডেন্ট, কিডনি ফাউন্ডেশন
 ডা. হাবিবুর রহমান
সহযোগী অধ্যাপক, রেনাল ট্রান্সপ্লান্টেশন ইউনিট
বঙ্গবন্ধু শেখমুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
 অধ্যাপক রফিকুল আলম
চেয়ারম্যান, নেফ্রোলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখমুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
 অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম
চেয়ারম্যান, ইউরোলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখমুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
 অধ্যাপক ফিরোজ খান
পরিচালক, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজ অ্যান্ড ইউরোলজি
 অধ্যাপক জামানুল ইসলাম ভুঁইয়া
বিভাগীয় প্রধান, ইউরোলজি
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজ অ্যান্ড ইউরোলজি
 ডা. কাজী রফিকুল আবেদীন
সহকারী অধ্যাপক, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজ অ্যান্ড ইউরোলজি
 ডা. পিনাকী ভট্টাচার্য্য
 মতিউর রহমান
সম্পাদক, প্রথম আলো

সঞ্চালক
আব্দুলকাইয়ুম
যুগ্ম সম্পাদক, প্রথম আলো
ডা. ইকবাল কবীর
বিভাগীয়সম্পাদক, স্বাস্থ্যকুশল, প্রথম আলো

আব্দুল কাইয়ুম
আজকের বিষয় হচ্ছে কিডনি রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিস্থাপন: বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত। আপনারা হয়তো দেখেছেন, প্রথম আলোর পক্ষ থেকে আমরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক করি। তার মধ্যে একটা হচ্ছে রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক বিষয়, যেটা দেশ পরিচালনার বিষয় নিয়ে। পাশাপাশি আবার স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা—এ ধরনের কতগুলো ছোট ছোট বিষয় নিয়েও আমার গোলটেবিল বৈঠক করি। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। পলিসি মেকারদের করণীয়গুলো সামনে নিয়ে আসা।

ইকবাল কবীর
আমরা দুটো উদ্দেশে এ আয়োজন করেছি। একটা হচ্ছে, কিডনি রোগ প্রতিরোধ করার জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়। আরেকটা হচ্ছে, বাংলাদেশেও যে কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশন হচ্ছে, সে বিষয়টি সামনে নিয়ে আসা। শুরুতেই ডা. হারুন অর রশিদ এ বিষয়ে সামগ্রিক কিছু বলবেন।

হারুন অর রশীদ
আমি মনে করি, কিডনি রোগ সম্পর্কে আমাদের দেশের মানুষজন খুব বেশি সচেতন নয়। এই সচেতনতাটা তৈরি করা সম্ভব পত্রিকার মাধ্যমে। ১৯৭০ সাল থেকে এ দেশে কিডনি রোগের চিকিৎসা শুরু হয়েছে। তখন কিডনি রোগটাকে ঠিক এভাবে বিবেচনা করা হতো না। গত ১০ বছর থেকে কিডনি রোগকে একটা আলাদা অসংক্রামক ব্যাধি হিসেবে ধরা হচ্ছে। এও বলা হচ্ছে, এটা আগামী দশকে একটা সাইলেন্ট এপিডেমিক হিসেবে পৃথিবীজুড়ে বিস্তার লাভ করবে। বিশ্বের কিডনি রোগের বিভিন্ন কর্ণধারের গবেষণায় এটা বেরিয়ে এসেছে। ১০ বছর আগে আমরা সাভারের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এক হাজার রোগীর ওপর একটা সমীক্ষা করেছিলাম। তখন আমরা দেখেছিলাম, ১০ শতাংশ লোক হাই ব্লাড প্রেসারে ভোগে, আড়াই শতাংশ ডায়াবেটিসে ভোগে আর আড়াই ভাগ লোকের প্রস্রাব পরীক্ষা করে অ্যালবুমিন পাওয়া যায়। তখন আমরা দেখেছিলাম, বাংলাদেশের ৭০ থেকে ৮০ লাখ লোক কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে ভোগে। এবং প্রায় ২০ হাজার লোকের কিডনি প্রতিবছর অকেজো হয়ে যাচ্ছে। ঠিক এর ১০ বছর পর আমরা দু-তিনটা সমীক্ষা করি। তখন আমরা দেখেছি, ডায়াবেটিসের সংখ্যা বেড়ে পাঁচ শতাংশে পৌঁছেছে, ব্লাড প্রেসারের সংখ্যা বেড়ে সাড়ে ১৮ শতাংশ হয়েছে আর ছয় শতাংশ লোকের প্রস্রাব দিয়ে অ্যালবুমিন যাচ্ছে। অর্থাৎ যাদের অ্যালবুমিন যাচ্ছে, তাদের সবারই কিডনি রোগ হয়ে গেছে। এবং অন্যদেরও কিডনি রোগ হওয়ার আশঙ্কা আছে। এখন বাংলাদেশে কিডনি রোগে আক্রান্তের সংখ্যা এক কোটি ৮০ লাখ। অতএব বলা যায়, বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশের মতো একটা দেশে কিডনি রোগ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। আমাদের দেশের ৬০ শতাংশ মানুষ জানেই না যে তাদের প্রস্রাবে অ্যালবুমিন আছে বা তার হাই ব্লাড প্রেসার আছে। জানে না বলেই কিন্তু তারা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয় না। যখন কোনো লক্ষণ শুরু হয়, তখনই তারা চিকিৎসার জন্য আসে। তখন তার প্রায় ৭০ ভাগ কিডনি নষ্ট হয়ে যায়। তখন তাদের বেঁচে থাকার জন্য কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশন করতে হয়। দুনিয়াজুড়ে এখন বলা হচ্ছে, যেহেতু কিডনি রোগ ডায়াবেটিস ও হাইপারটেনশনের একটা প্রধান কারণ এবং নেফ্রাইটিস আরেকটা কারণ। সে জন্য এ রোগকে প্রতিরোধ করার জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। আর দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, যখন রোগী একবার ডায়ালাইসিস করাতে যায়, তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আমেরিকায় সবাই ডায়ালাইসিস করাতে পারছে। তারা সামনের বাজেটে প্রায় ২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করবে শুধু এই ডায়ালাইসিসের জন্য। আর আমাদের সরকারের গোটা স্বাস্থ্য বাজেট হচ্ছে জিএনপির দেড় শতাংশ। ফলে আমরা কোনো দিকেই যেতে পারছি না। আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের প্রায় চার শতাংশ মানুষের ডায়ালাইসিস করার সামর্থ্য আছে। বাংলাদেশে এখন ৪২টি ডায়ালাইসিস সেন্টার আছে আর আটটি কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশন সেন্টার আছে। এই সেন্টারগুলো মাত্র তিন হাজার নতুন রোগীকে ডায়ালাইসিস দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এই করুণ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় হচ্ছে, ডায়ালাইসিস ও ট্রান্সপ্লান্টেশনকে সম্প্রসারণ করা। আমরা চেষ্টা করছি ডব্লিউএইচওর তালিকায় কিডনি রোগকে রাখার জন্য।

ইকবাল কবীর
ধন্যবাদ হারুন স্যারকে। এবার অনুরোধ করছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নেফ্রোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক রফিকুল আলমকে এ বিষয়ে কিছু বলার জন্য।

রফিকুল আলম
সারা দুনিয়ায় সবাই এখন কিডনি রোগটাকে সাইলেন্ট এপিডেমিক হিসেবে স্বীকার করে নিচ্ছে। আমি আশা করি, ডব্লিউএইচও ও অন্য সংগঠনগুলোও এ সত্যটা মেনে নেবে। অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশে এই চিকিৎসার কোনো রকম সাপোর্ট সিস্টেম নেই বললেই চলে। আমাদের দেশের জন্য এই চিকিৎসা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে শতকরা ৪৫ ভাগ কিডনি রোগ হচ্ছে নেফ্রাইটিস থেকে। বেশির ভাগ নেফ্রাইটিস যদি প্রথম অবস্থায় ধরা পড়ে, সেগুলোর বিভিন্ন রকম অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করা যায়। অর্থাৎ আপনি ক্রনিক কিডনি ডিজিজ প্রিভেন্ট করতে পারছেন। এ জন্য অবশ্য ডায়াবেটিসের উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণ দরকার। হেলথ ইন্স্যুরেন্স যদি আমরা চালু করতে পারি, এর মাধ্যমে আমরা ডায়ালাইসিস চিকিৎসার একটি অংশের সংস্থান করতে পারি। ব্যাপক সচেতনতা যদি আমরা সৃষ্টি করতে পারি, তাহলে হয়তো অনেকেই এগিয়ে আসবেন। এতে ব্যয়টা অনেক কমে যাবে। এ ছাড়াও কিডনি রোগ প্রতিরোধের প্রচলিত ধারাগুলোও আমাদের বেগবান করা জরুরি।

ইকবাল কবীর
আলোচনা ভালোর দিকে এগোচ্ছে। আমরা আমাদের সফলতার খবরও শুনতে চাই। আমাদের এখানে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশন ইউনিটের সহযোগী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান আছেন। এবার তিনি বলবেন।

হাবিবুর রহমান
প্রথমেই প্রথম আলোকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য। আমরা আলোচনায় দেখলাম, কিডনি ফেইলড হয়ে যাওয়ার পরপর আমাদের হাতে যা চিকিৎসা থাকে, তা হলো ডায়ালাইসিস। আরেকটা হলো কিডনি প্রতিস্থাপন করা, যাকে আমরা কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশন বলি। আমাদের দেশে দুই যুগ ধরে আমরা কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করে আসছি। প্রথম দিকে আমাদের অভিজ্ঞতা কম ছিল। আমাদের রেজাল্টও তেমন একটা ভালো ছিল না। কিন্তু পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে কিডনি প্রতিস্থাপনের যে রেজাল্ট, পৃথিবীর অন্যান্য যে ভালো সেন্টার আছে, সেগুলোর মোটামুটি কাছাকাছি। যদিও আমাদের লোকবল, আমাদের সুযোগ-সুবিধা ওদের তুলনায় অনেক অনেক কম। তার পরও আমরা অনেক দূর এগিয়ে আছি। আমাদের একটা দুঃখের বিষয় যে আমাদের এই সফলতার কথা ফলাও করে প্রচার হয়নি। এ দেশে মোট আটাট সেন্টারে আমরা কিডনি প্রতিস্থাপন করছি সফলতার সঙ্গে। আমাদের এখন উদ্দেশ্য হবে, প্রথম আলো বিশেষ করে মিডিয়ার কাছে আমাদের একটা আবেদন থাকবে এই জিনিসগুলো তুলে ধরর। জনগণের এই চিকিৎসার জন্য বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে বাইরে যাচ্ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার যে অনেকে জানেও না, কিডনি প্রতিস্থাপন করার পর তাকে লাইফ লং একটা চিকিৎসার আওতায় আসতে হবে। তাকে পরবর্তী সময়ে অনেক ওষুধ খেতে হবে। এই কাউন্সেলিংটা হয় না। বাইরে গিয়ে ১৫-২০ লাখ টাকা খরচ করার পর সে চলে এল। চলে আসার পর আবার বারবার যেতে হবে। প্রতিবারই তিন থেকে চার লাখ টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। একসময় সে ফলোআপে যেতে পারছে না। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা খুব কম খরচে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি এবং আমি বলব, এ ব্যাপারে সরকার বা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাভ তো হয়ই না, বরং লোকসান হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এক লাখ টাকার মতো আমরা একটা বাজেট নিই। যেটা বাইরে গেলে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা খরচ হয়ে যায়। কিডনির যে প্রতিস্থাপন, এটা খুব জটিল একটা ব্যাপার। কিডনি খুব সেনসিটিভ ইস্যু। এখন জনগণ সচেতন হচ্ছে। এখন ডোনারের অভাব আস্তে আস্তে দেখা দিচ্ছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য যেসব রোগী আইসিইউতে মারা যায়, তার থেকে আমরা কিডনিটা নিতে পারি। এই সচেতনতাটা জনগণের মধ্যে আনতে হবে। তাহলে আমরা এ ব্যাপারে আরও সফল হব। জরুরি বিভাগে যেসব রোগী বেওয়ারিশ হয়ে যাচ্ছে, এদের কাছ থেকেও আমরা কিডনি নিতে পারি। ফলে ডোনারের যে স্বল্পতা আমাদের, তা থেকে আমরা বের হয়ে আসতে পারি। আগে আমরা পেট কেটে কিডনিটা নিতাম। এখন আরও উন্নত ব্যবস্থা চলে এসেছে। যা মাত্র চারটা ফুটো করে আমরা কিডনিটা নিতে পারি। আমরাও আশা করি, ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে আমরা এটাও করতে পারব। ফলে লিভিং ডোনার কিছুটা দুশ্চিন্তামুক্ত থাকবে। আমাদের বর্তমান যে লোকবল আছে, তা দিয়েই আমরা প্রতি সপ্তাহে একটা করে কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করছি। আমরা প্রতি সপ্তাহে দুটি করে করার মতো ব্যবস্থা নিচ্ছি। এখন আমাদের অনেক রোগী অপেক্ষমাণ তালিকায় আছে। মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণক্ষমতা অনেক কম থাকায় অনেক প্রস্তুত রোগীকেও আমরা সময়ের অভাবে ট্রান্সপ্লান্ট করতে পারছি না। আর ভবিষ্যতে আমরা ব্যয়টা কমিয়ে আনতে পারব। আমরা যদি সেন্টারগুলো বাড়াতে পারি, আমার মনে হয় আর বাইরে গিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা যে খরচ হচ্ছে, এ থেকে আমরা মুক্তি পাব এবং জনগণ উপকৃত হবে।

ইকবাল কবীর
ধন্যবাদ। আমাদের এখানে অধ্যাপক জামানুল ইসলাম ভুঁইয়া আছেন। তিনি বাংলাদেশ কিডনি ডিজিজ অ্যান্ড ইউরোলজিতে এই ট্রান্সপ্লান্টেশনের কাজে জড়িত আছেন। সামগ্রিকভাবে এর সাকসেস রেটটা কী? আমরা তো শুনলাম, বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে, আপনাদের ওখানেও হচ্ছে। এ বিষয়টা যদি একটু আলোকপাত করেন।

জামানুল ইসলাম ভুঁইয়া
এ রকম একটা অনুষ্ঠান আয়োজন করার জন্য মতিউর রহমানকে ধন্যবাদ জানাই। প্রথমেই বলতে চাই, কিছু কিছু ডিজিজ আছে, যেগুলো ইউরোলজিক্যাল ডিজিজ। যেমন পাথর। পাথর নিয়ে অনেক সময় দেখা যায়, রাগীরা এলে আমি জিজ্ঞেস করি, আপনি এত দিন ধরে বসে আছেন কেন? তারা জবাব দেয়, স্যার, ব্যথা তো হয় না। এ রকম কতগুলো ডিজিজ আছে যেমন—পাথর, টিউমার, ক্যানসার, প্রোস্টেট গ্লান্ড বেড়ে যাওয়া। এ ছাড়া মা-বোনদের ব্যাপারে আমি বলব, আমাদের মহিলা ইউরোলজিস্ট নেই। হয়তো কিছু দিনের মধ্যে আমরা তা পেয়ে যাব। তারা সহজেই একটা পুরুষ ডাক্তারের কাছে আসতে চায় না। হয়তো দেখা গেল, তার প্রস্রাবের রাস্তাটা একটু সরু হয়ে আছে। সে কষ্ট করে প্রস্রাব করে। কিন্তু সে আসে না। যখন এল তখন দেখা গেল, কিডনি ড্যামেজ করে চলে আসে। অথচ আমাদের কাছে এলে এই চিকিৎসা পাঁচ মিনিটও লাগে না। এ ধরনের কিছু কিছু রোগ যেগুলো প্রিভেন্ট করা যায়, আমার মনে হয় এগুলো মিডিয়ার মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার আমাদের দেশে একটা ইনস্টিটিউট তৈরি করেছে, যেটার নাম ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজ অ্যান্ড ইউরোলজি। ২০০৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত আমরা বছরে প্রায় তিন হাজার অপারেশন করেছি। ট্রান্সপ্লান্ট করছি দেড় বছর ধরে। এখানে খুব কম খরচে চিকিৎসা হয়। যেমন কিডনির পাথর ভাঙা। এ জন্য যদি কেউ বাইরে যায়, অনেক সময় ৬০ হাজার টাকার মতো লাগে। আর আমাদের এখানে লাগে পাঁচ হাজার টাকা। এরপর আবারও যদি ওই একই চিকিৎসায় তিনি আমাদের কাছে আসেন, তখন কোনো টাকা লাগে না। এ বিষয়গুলো প্রচার করার জন্য আমি বেশি বলব।

হারুন অর রশীদ
১৯৮২ সাল থেকে আমাদের দেশে কিডনি প্রতিস্থাপন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়েছে। কোনো সন্দেহ নেই, এর ফলাফল অত্যন্ত ভালো। আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, যার টাকা আছে, তার ডোনার নেই আর যার ডোনার আছে তার টাকা নেই। সমাজের প্রতি রাষ্ট্র ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বেশ দায়িত্ব আছে। আর স্কুল হেলথের ক্ষেত্রে শুধু স্কুলে নয়, আমাদের দেশের মা-বোনেরা যখন শপিংয়ে যায়, দেখবেন আমাদের দেশে মার্কেটগুলোয় কোনো ভালো টয়লেট নেই। এটা নারীদের ইউরিন ইনফেকশনের একটা অন্যতম কারণ। আরেকটা বিষয় হলো, আমাদের ব্রেন ডেথ কোনো ডোনার নেই। আমরা যা পাই, তাঁরা হলেন লিভিং ডোনার। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এই ব্রেন ডেথ ডোনার আছে। এতে ধর্মীয় কোনো বাধা নেই।

কাজী রফিকুল আবেদিন
আমি এই আলোচনার শেষ কথাটি দিয়ে শুরু করতে চাই। বাংলাদেশ এবং এ দেশের মানুষ তাদের জন্যই আমাদের চিকিৎসা। আমরা শুধু চিকিৎসা দিয়ে থাকি। আমাদের জিডিপির এক দশমিক পাঁচ ভাগ মাত্র ব্যয় হয় চিকিৎসা ক্ষেত্রে। আমরা বাজেটে একজনের চিকিৎসার জন্য যে টাকা পাই তা হলো ১.০৭ টাকার মতো। এ দেশের জনসংখ্যার বিরাট অংশ শুধু দারিদ্র্যপীড়িত নয়, প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। কুসংস্কারের বেড়াজালে এদের জীবন অতিষ্ঠ। এই জনগোষ্ঠী এখনো আধুনিক চিকিৎসাসেবার আওতার বাইরে। আমরা তাদের জন্য রাষ্ট্রই বলি, সামাজিক সংগঠনই বলি আর আমাদের ব্যক্তি উদ্যোগের কথাই বলি না কেন, কেউই আজ পর্যন্ত তাদের জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক অথবা চিকিৎসার যে পরিধি ও নিরাপত্তাবলয়, তা তৈরি করতে পারেনি। এ রকম একটা অবস্থায় আমরা কিডনি রোগ ও প্রতিস্থাপন নিয়ে কথা বলব। কিডনি অসুস্থতার প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বলতে চাই, এ দেশে কিডনি অসুস্থতার মূল কারণ হচ্ছে বহুমূত্র, উচ্চরক্তচাপ ও কিডনিতে প্রদাহ। এর বাইরেও কিছু অসুস্থতা আছে, যা কিডনিকে অসুস্থ করে, জাতিকে অসুস্থ করে এবং চিকিৎসাব্যয়টা প্রায় অসম্ভবের জায়গায় দাঁড় করায়।
আমাদের দেশে এখন অনেক পুষ্টিকর খাদ্যের চেয়ে ওষুধ অনেক সস্তা ও সহজলভ্য। আরেকটা কথা বলা দরকার, তা হলো খাদ্যে বিষক্রিয়া বা খাদ্যে ভেজাল। এটাও কিডনি অসুস্থতার একটা কারণ। এসব কারণ কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য। উচ্চরক্তচাপ ও বহুমূত্র রোগও কিন্তু নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। আর এ জন্য বেশি প্রয়োজন জনসচেতনতা। আমার কাছে মনে হয়, যেসব কারণে কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয় তার শতকরা ৮০ ভাগই প্রতিরোধযোগ্য এবং এটা প্রতিরোধ করে আমরা আমাদের দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীকে কিডনি বিকল থেকে রক্ষা করতে পারি। কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য আমাদের কিডনি দরকার। এই কিডনি আমরা পাই জীবিত মানুষের কাছ থেকে, আরেকটি পাই আমরা স্নায়ুবিকভাবে মৃত মানুষের কাছ থেকে। বর্তমান সরকার ১৯৯৯ সালে তাদের শাসন আমলে একটি আইন করেছে। আইনটি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং যথেষ্ট যৌক্তিক। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে ব্যবসা বন্ধ করার জন্য এ আইনটি করা হয়েছিল। আমি আশা করব, এ আইনটি যদি গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়, তাহলে মানুষের সচেতনতাটা বেড়ে যাবে। ব্রেন ডেথের কাছ থেকে কিডনি নেওয়ার আমাদের সমস্যা হলো, আমরা একেবারে ভৌত অবকাঠামো তৈরি করতে পারিনি। এ জন্য দেশব্যাপী একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে যার কিডনি লাগবে এবং যে কিডনি দিতে চায়, তাদের ডেটাগুলো এন্ট্রি করা থাকে। পরে মিলে গেলে তাদের খোঁজ দেওয়া হয়।

ইকবাল কবীর
ধন্যবাদ ডা. কাজী রফিকুল আবেদীনকে। এবার ডা. পিনাকী ভট্টাচার্যকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করছি।

পিনাকী ভট্টাচার্য
হারুন স্যারের চাপাচাপিতে প্রথম ডায়ালাইসিস মেশিনটা এখানে আনা হয়েছিল। এটা এনে তিন বছর ধরে আমরা বাংলাদেশের মানুষকে সেবা দিচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য ছিল যে এটা আমাদের প্রোফিট সেন্টার হবে না। তাই আমরা অনেক সুলভে এটাকে সরবরাহ করছি। কিন্তু পরে সরকার এটার ওপর ভ্যাট চালু করে। যেটা এখনো আছে। এটা কিন্তু আসলে ঠিক নয়। এখন CAPD-এর মাধ্যমেও ডায়ালাইসিস করা যায়। এর মাধ্যমে পেটে একটা টিউব বসিয়ে দিতে হয়। এটা রোগী বাসায় বসে করতে পারে। আমার কাছে মনে হয়, যাঁরা প্রাইমারি লেভেলে কিডনি চিকিৎসা দেন, তাঁরাও যদি সচেতন হন, তাহলে রোগীদের আর্থিক বোঝা অনেকটাই কমে যাবে।

ইকবাল কবীর
ধন্যবাদ। এবার আমি অনুরোধ করব অধ্যাপক ফিরোজ খানকে কিছু বলার জন্য।

ফিরোজ খান
প্রথম আলো বদলে দেওয়ার কথা বলে। পরিস্থিতি বদলানোটাই বড় কথা। সব কথা প্রায়বলা হয়ে গেছে। আমাদের ইনস্টিটিউটে প্রতিদিন আউটডোরে ৩০০-৪০০ রোগী আসে। তাই কিডনি রোগ প্রতিরোধ করাটা খুবই যুগোপযোগী। যেমন চুলকানি থেকে যে ঘা হয়, সেই ঘা থেকে আবার কিডনি ডিজিজ হতে পারে। এসব রোগ কিন্তু আবার সহজেই প্রতিরোধ করা যায়।

ইকবাল কবীর
এবার অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলামকে বলার জন্য অনুরোধ করছি।

আনোয়ারুল ইসলাম
কিছু কিছু ইউরোলজিক্যাল ডিজিজ আছে, যেটার আমরা সঠিক সময়ে যদি চিকিৎসা করি, তাহলে কিডনিকে পুরোপুরি নষ্ট হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারি। জন্মগত ত্রুটি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জন্মগত ত্রুটিগুলোর সঠিক সময়ে যদি আমরা চিকিৎসা করি, তাহলে আমরা জটিল কিডনি রোগ প্রতিরোধ করতে পারব। ইউরোলজিক্যাল ডিজিজ থেকেও কিডনি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই আমাদের সচেতন হতে হবে। বয়স্কদের প্রস্রাবে বাধাজনিত কারণে এই কিডনি রোগ হতে পারে। কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশনের মধ্যে বেশ কিছু ইস্যু আছে। আমরা যদি ট্রান্সপ্লান্টেশন করতে চাই, তাহলে কিন্তু আমাদের দায়িত্বটা শেষ হয়ে যাচ্ছে না। এর মধ্যে আমাদের আর্থসামাজিক ও শিক্ষাগত সমস্যা জড়িত। তাই আমাদের সমাজকে উদ্বুদ্ধ করা দরকার। আর এ ধরনের চিকিৎসার জন্য ফান্ড গঠন করতে হবে। তাই এ ক্ষেত্রে আমাদের সামাজিক দায়িত্বটা অনেক। ব্রেন ডেথের ধারণাটা সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচার করা যেতে পারে। পুরোটাই আমাদের উদ্যমের ব্যাপার। ডায়ালাইসিস ও ট্রান্সপ্লান্টেশনের মাঝামাঝি আরেকটা পন্থা আছে। আর তা হলো সরাসরি ট্রান্সপ্লান্টেশন। এর মাধ্যমে রোগীদের অর্থনৈতিক খরচটা অনেক কমে আসবে। এতে ডায়ালাইসিসের আর্থিক কষ্টটা লাঘব হবে।

ইকবাল কবীর
ধন্যবাদ অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলামকে।

ফিরোজ খান
আগে কিন্তু কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করার জন্য সার্জন পাওয়া যেত না। আর এখন শুধু কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশনের জন্যও সার্জন পাওয়া যায়। এটা আমাদের জন্য অনেক ভালো একটা দিক।

ইকবাল কবীর
আমরা এখানে একটা সামগ্রিক আলোচনা পেলাম। আমি আশা করব, এ সরকার বিষয়টির প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দেবে। আমি আবারও হারুন অর রশীদ স্যারকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করছি।

হারুন অর রশীদ
আমরা প্রায় এক বছরধরে চেষ্টা করছিলাম, বাংলাদেশে ট্রান্সপ্লান্টেশন কীভাবে করা যায়। আমাদের শরীরে দুটো কিডনি ছাড়াও লিভার, হার্ট এগুলো ট্রান্সপ্লান্ট করা সম্ভব। আপনারা জেনে খুশি হবেন যে এ ব্যাপারে বর্তমান চিকিৎসকদের যথেষ্ট ধারণা আছে। তাই আমরা মনে করছি, কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করা খুবই জরুরি। আমাদের যদি পর্যাপ্ত পরিবেশ এবং কিডনি দেওয়া যায়, তাহলে আমরা এ প্রক্রিয়া এখনই চালু করতে পারি। কিন্তু এর জন্য লাগবে ব্রেন ডেথ কিডনি ও ব্রেন ডেথ কমিটি, যে কমিটিটা এখনো আছে। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি এবং আমরা আশা করি, টিম যদি সেভাবে কার্যকরী উদ্যোগ নেয়, তাহলে মরণোত্তর ট্রান্সপ্লান্টেশন আমাদের বাংলাদেশে সম্ভব। এবং লিভার ও হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট এর সঙ্গে করা যাবে। আমরা এখন চাইছি যে জনসাধারণ এ বিষয়টা ব্যাপকভাবে জানুক। কিডনি রোগ প্রতিরোধে চল্লিশ পেরুলেই প্রস্রাবে অ্যালবুমিন মাপুন, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস চেক করুন।

মতিউর রহমান
আপনাদের সবাইকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি এই বৈঠকে অংশগ্রহণ করার জন্য। আপনারা যে প্রস্তাবগুলো করলেন, আমরা আমাদের পত্রিকার মাধ্যমে সেগুলো জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে চেষ্টা করব। এটা খুব সুখের বিষয় যে বাংলাদেশে সফলভাবে কিডনি প্রতিস্থাপন হচ্ছে। কিডনি বিষয়ে জনসচেতনতামূলক লেখা কিংবা দৃষ্টি আকর্ষণী বিজ্ঞাপনের মতো কিছু তৈরি করে দিলে আমরা স্বাস্থ্যপাতাসহ প্রথম আলোতে ছাপার ব্যবস্থা করব। প্রথম আলো থেকে আমরা বদলে দেওয়ার কথা বলি, আসুন, সবাই মিলে আমরা জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার কাজ করি। অধ্যাপক হারুন এবং আপনাদের উদ্যোগের পাশে আমরা সব সময়আছি। আপনাদের সবাইকে আবারও ধন্যবাদ।



কিডনি সুস্থ রাখুন

বিশ্বজুড়ে ২৮ কোটিরও বেশি লোক ভুগছে ডায়াবেটিসে। এভাবে চলতে থাকলে ২০২৫ সালে তা ৪৪ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে অনুমান। অনেকেই জানেননা যে ডায়াবেটিসের সঙ্গে কিডনি রোগের রয়েছে ঘনিষ্ট সম্পর্ক। বস্তুত: ডায়াবেটিসে আক্রান- লোকের এক তৃতীয়াংশের রয়েছে ডায়াবেটিস জনিত কিডনি রোগ, ডাক্তারি ভাষায় ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি। এসব বিষয় জনগণকে জানাতে হবে, জনগণকে সচেতন করে তুলতে হবে। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর আচরণ না করা, স্থূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করা, এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্ত চাপের সনাক্ত করণের জন্য আগাম স্ক্রিনিং করা এসব কাজের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত কর্মসূচী ও উদ্যোগ। এমন অনেক লোক রয়েছেন যাঁরা জানেনইনা যে ইতিমধ্যে তাঁদের কিডনির অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে অজান্তেই। যখন তা জানাগেলো তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। কিডনি রোগ যদি আগাম সনাক্ত করা যায় তাহলে এড়ানো যাবে ডায়ালিসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপনের মত দুর্ভোগ। যারা ইতিমধ্যে কিডনি রোগে আক্রান- তারা যা করতে পারেন তা হলো তাঁরা তাদের রোগ ঘটার গল্প লিখতে পারেন, বলতে পারেন, বন্ধু ও স্বজনদেরকে। কিডনি রোগের ঝুঁকি সম্বন্ধে সচেতন করে তুলতে পারেন। রয়েছে জাতীয় কিডনি ফাউন্ডেশন দেশে দেশে, আছে আমাদের দেশেও। সরকারের সঙ্গে একত্রে তারা এব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা ও কিডনি রোগ আগাম সনাক্ত করার ব্যাপারে বড় রকমের উদ্যোগ নিতে পারেন। আমাদের দেশের কিডনি ফাউন্ডেশন সে লক্ষ্যে কাজ করছেন।

বিশ্ব কিডনি দিবস প্রতিবছর দেশে দেশে পালিত হয় আন্তর্জাতিক নেফ্রোলজি সমিতি (ওঝঘ) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব কিডনি ফাউন্ডেশন (ওঋকঋ) যৌথ উদ্যোগে। বিশ্ব কিডনি দিবসের লক্ষ্য হলো
০ সার্বিক স্বাস্থ্যে কিডনির গুরুত্ব সম্বন্ধে জনগণকে সচেতন করা এবং কিডনি রোগের প্রকোপ ও অনুষঙ্গী স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো বিশ্বজুড়ে হ্রাস করার প্রচেষ্টা নেওয়া।
০ বিস্ময়কর এই দেহযন্ত্র কিডনি সম্বন্ধে সচেতনতা বাড়ানো অন্যতম উদ্যোগ
০ ক্রনিক কিডনি রোগের মূল ঝুঁকি হলো ‘ডায়াবেটিস’ ও ‘উচ্চরক্ত চাপ’ একে জোরালো ভাবে উপস্থাপন করা।
০ ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ যাদের রয়েছে তাদের সবাইকে পর্যায়ক্রমে ক্রনিক কিডনি রোগ রয়েছে কিনা তা স্ক্রিনিং করে দেখা।
০ প্রতিরোধমূলক আচরণ সম্বন্ধে অবহিত করা।
০ ক্রনিক কিডনি রোগ (ঈকউ), বিশেষ করে উচ্চ ঝুঁকি মানুষের মধ্যে আগাম চিহ্নিত করার ব্যাপারে চিকিৎসা পেশাজীবিদের প্রধান ভূমিকা সম্বন্ধে শিক্ষিত করে তোলা।
০ স্থানীয় ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও দায়িত্ব রয়েছে ক্রনিক কিডনি রোগ প্রতিরোধে, সে সম্বন্ধে জোরালো ভাবে তাদের জানানো।

আগাম চিহ্নিত হলে, ক্রনিক কিডনি রোগের চিকিৎসা করা যায় ফলপ্রসূভাবে, কমে যায় জটিলতা এবং এভাবে বিশ্বজুড়ে ক্রনিক কিডনি রোগ ও হৃদরোগের কারণে মৃত্যু ও রুগ্নতা কমবে নাটকীয়ভাবে। কিডনি রোগ নীরবে ধীরে ধীরে হতে থাকে শরীরের মধ্যে, আর অন্তিম পর্যায়ে রোগ পৌছানোর সময়ে দেখা দেয় উপসর্গ, তখন ডায়ালিসিস ও ট্রান্সপ্লান্ট করা ছাড়া গত্যন-র থাকেনা। মূত্রের কটিন পরীক্ষা, রক্তের ক্রিয়োটিনিন ও রক্তচাপ মেপে দেখলে কিডনি রোগের আগাম সংকেত পাওয়া যায়। অনেকে জানেন না যে ক্রনিক কিডনি রোগের সূচনা পর্যায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধরা পড়েনা। অথচ একে পরীক্ষা করতে হলে চাই রক্ত ও প্রস্রাবের নমুনা এবং তাও সামান্য পরিমাণে। কিডনির ক্ষতি হলে প্রস্রাবে প্রোটিন যেতে থাকে। তাই প্রস্রাবে এলবুমিন (প্রোটিন) আছে কিনা সেজন্য রয়েছে অত্যন- কম খরচে, কার্যকরী পরীক্ষা। পরপর ক’দিন প্রস্রাবে প্রোটিন যাওয়া ক্রনিক কিডনি রোগের চিহ্ন।

কিডনির সার্বিক অবস্থা জানানোর জন্য ডাক্তার রক্তের নমুনায় ক্রিয়েটিনিন মান দেখেন, গণনা করে দেখেন কিএফআর বা গ্লমেরুলার ফিলট্রেশন হার। আর ডায়াবেটিস আছে কিনা তা জানেন রক্তের সুগার মেপে। মেপে দেখেন রক্তচাপও।

তাই আগাম চিহ্নিত করলে এবং ক্রনিক কিডনি রোগের চিকিৎসা করলে কেবল যে রোগীর কিডনি রোগের অন্তিম পর্যায়ে যাওয়াই ঠেকায় তাই নয়, হ্রাস করে আনে হৃদরোগের সম্ভাবনা, যা বিশ্বজুড়ে অকাল মৃত্যুর একটি বড় কারণ।

রক্তের ক্রিয়েটিনিন সম্বন্ধে একটু জানি: ‘ক্রিয়েটিনিন’ হলো রক্তের একটি বর্জ্য যা পেশির কাজকর্ম থেকে উদ্ভূত। এটি রক্ত থেকে স্বাভাবিকভাবে সরিয়ে নেয় কিডনি, তবে যখন কিডনির কাজকর্ম ধীর হয়ে আসে, তখন রক্তে ক্রিয়েটিনিন মান বেড়ে যায়। রক্তের ক্রিয়েটিনিন মানকে চিকিৎসক ব্যবহার করে বের করে ফেলেন কিডনি ফাংশন বা জি.এফ.আর। গ্লমেরুলার ফিলট্রেশন রেট (এঋজ) রক্তের জিএফআর থেকে জানা যায় কিডনির কাজ কর্মের পরিমাণ। রক্তের ক্রিয়েটিনিন মান জানলে, একটি বিশেষ ফর্মূলা ব্যবহার করে, জিএফআর গণনা করা যায়। স্বাভাবিক জিএফআর হলো ১০০ মিলিলিটার/মিনিট এর চেয়ে নিচে হলে বোঝা যায় কিডনির কাজকর্ম কমে আসছে। জিএফআর যদি ৬০ মিলি লিটার/ মিনিটের নিচে নামে তাহলে একজন কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞকে দেখানো জরুরী। জিএফআর ১৫ এর নীচে হলে কিডনি বিকল হওয়ার নিদর্শন-ডায়ালিসিস বা কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট তখন প্রয়োজন হতে পারে।

কিডনিকে ভালো রাখার জন্য রয়েছে সাতটি সুবর্ণ সূত্র:- কিডনি রোগ হলো নীরব ঘাতক। যা জীবনে গুণগত মানের উপর প্রভাব ফেলে। তবে কিডনি রোগ যাতে না হয় সেজন্য রয়েছে কিছু সহজ উপায়।

১. শরীরকে ফিট রাখা ও সক্রিয় থাকা- কমে রক্তচাপ-কমে কিডনি রোগের ঝুঁকি। (No the move for kidney health)
২. রক্তের সুগার নিয়মিত নিয়ন্ত্রণে রাখা।
৩. রক্তের চাপ মেপে দেখা, ১২০/৮০ থাকতে হবে।
৪. স্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণ করা এবং ওজন ঠিক রাখা। নুন কম খান, আধ চামচের বেশী নয়।
৫. ধূমপান না করা।
৬. যখন তখন নিজের ইচ্ছামত ওষুধ কিনে না খাওয়া।
৭. যদি থাকে, ডায়াবেটিস উচ্চরক্ত চাপ, স্থূলতা, পরিবারে যদি কারো থাকে কিডনি রোগ-আফ্রিকান, এশিয়ান ও আদিবাসী হলে কিডনির কাজকর্ম চেক করে দেখতে হবে।


মহিলাদের কিডনি রোগ


প্রস্রাবের সময় জ্বালা পোড়া, ঘন ঘন অল্প অল্প প্রসাব, প্রস্রাব করার পরও প্রস্রাবের ইচ্ছে থাকা, তলপেটে ও কোমরের দুই পারে পেছনে ব্যথা, কখনও কাপুনি দিয়ে জ্বর আসা, প্রস্রাব দুর্গন্ধযুক্ত, ঘোলা কখনও রক্তমাখা ইত্যাদি প্রস্রাবের প্রদাহের প্রধান লক্ষণ।

চাঁদের মত ফুটফুটে সুন্দর মেয়ে শাকিলা। প্রথম সন্তানের মা হতে যাচ্ছে। সংসারে আনন্দ আর সাজ সাজ ব্যস্ততা। নতুন আগন্তককে স্বাগতম জানাতে। কিন্তু বিষাদের ছায়া নেমে এল যখন চিকিৎসক জানালেন, গর্ভে বাচ্চার সমস্যা হচ্ছে। তড়িঘড়ি করে অপারেশন করা হল। বাচ্চাটা প্রাণে বেঁচে গেল। কিন্তু মায়ের প্রস্রাব গেল বন্ধ হয়ে। প্রথমে আই.সি.ইউ, পরে ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতালের ৫ম তলায় শাকিলা ভর্তি হলেন। তার জীবন বেঁচে আছে ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে। আজ সে কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বললো-আমার সন্তানের কাছে কখন যেতে পারবো ? আমি নির্দিষ্ট করে বলতে পারিনি, শাকিলার কিডনি আবার কতদিন পর কার্যক্ষম হবে? তবে শাকিলা ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে সুস্থভাবে বেঁচে আছে এবং আশা করছি তার কিডনি আবার কাজ শুরু করবে। যেহেতু তার আকস্মিক কিডনি ফেইল্যূর হয়েছে। তবে শাকিলার মত কতভাগ লোক আছে, যারা এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারে। তাদের জন্য আমি কিছু সতর্কতার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই:

মেয়েরা সাধারণত যতদিন পর্যন্ত প্রজননক্ষম থাকে ততদিন তাদের কিডনি রোগ পুরুষদের তুলনায় কম হয়। তবে কতগুলো ক্ষেত্রে মেয়েরা কিডনি রোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যেমন: গর্ভবতী মেয়েরা উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-অ্যাকলাম্পশিয়া, অ্যাকলাম্পশিয়া, গর্ভপাত জনিত কিডনি ফেইল্যুর, প্রস্রাবে প্রদাহ, পূর্ববর্তী কিডনি রোগ সক্রিয় হয়ে উঠা ও অপারেশনজনিত কিডনি ফেইল্যুর এ আক্রান্ত হতে পারে। তা ছাড়া মেয়েদের প্রস্রাবে ইনফেকশন ছেলেদের তুলনায় অনেক বেশি। বাতজনিত রোগ থেকে কিডনি আক্রমণ যেমন: Systemic Lupus Erythematosus মেয়েদের ক্ষেত্রে ছেলেদের তুলনায় ৯ গুন বেশী হয়ে থাকে।

গর্ভবতী মহিলাদের উচ্চ রক্তচাপ থেকে কিডনি বিকলের সম্ভবনা
স্বাভাবিক সুস্থ মহিলাদের রক্তচাপ গর্ভবতী অবস্থায় নেমে যায়। বিশেষ করে ডায়াসটলিক প্রেসার ১০-১৫ এবং সিসটোলিক ১৫-২৫ মিলি নেমে যায়। কাজেই গর্ভবতী অবস্থায় রক্তচাপ পূর্বের মত থাকাতেই উচ্চ রক্তচাপ হিসেবে গণ্য করতে হবে। বিশেষ করে ডায়াসটলিক প্রেসার যদি ৯০মি:মি: এর উপরে থাকে তবে তা উচ্চ রক্তচাপ হিসাবে চিকিৎসা করতে হবে। গর্ভবস্থায় মহিলাদের উচ্চ রক্তচাপ চার ভাগে ভাগ করা যায়। প্রি-অ্যাকলাম্পশিয়া, অ্যাকলাম্পশিয়া, কিডনি সংক্রান্ত উচ্চ রক্তচাপ ও পূর্ব থেকেই থাকা উচ্চ রক্তচাপ।

প্রি-অ্যাকলাম্পশিয়া ও অ্যাকলাম্পশিয়া
যে সমস্ত গর্ভবতী মহিলাদের গর্ভধারণের পর প্রাথমিক পর্যায়ে রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকে কিন্তু গর্ভবতী হওয়ার ২০ সপ্তাহ পর হঠাৎ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হয়, সাথে প্রস্রাবে অ্যালবুমিন নির্গত হয়, রক্তে অ্যালবুমিন কমে আসে, এই অবস্থাকে প্রি-অ্যাকলাম্পশিয়া বলা হয়। মনে রাখতে হবে দ্রুত চিকিৎসার মাধ্যমে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ না করলে রক্তচাপ দ্রুত বেড়ে গিয়ে মা ও সন্তানের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। কিডনি ফেইল্যুর হতে পারে। প্রি-অ্যাকলাম্পশিয়ার সাথে যদি খিঁচুনী দেখা যায়, তবে তাকে অ্যাকলাম্পশিয়া বলে। এটি গর্ভবতী মায়ের জন্য একটা জরুরি অবস্থা। স্ত্রী রোগ ও কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে সর্বোচ্চ সর্তকতার সাথে চিকিৎসা করতে হবে। প্রয়োজনে মায়ের জীবন রক্ষার্থে গর্ভপাত ঘটাতে হবে, নয়তো সময়ের পূর্বেই বাচ্চা ডেলিভারি করাতে হবে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে। এ যাত্রায় সুস্থ হয়ে গেলেও ভবিষ্যতে এদের উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিতে পারে। প্রস্রাবে অ্যালবুমিন যেতে থাকতে পারে-ফলে কিডনি বিকল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই প্রি-অ্যাকলাম্পশিয়া ও অ্যাকলাম্পশিয়ার রোগীদের কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে থাকা উচিত।

পূর্ব থেকে কিডনি রোগ থাকলে গর্ভবতী হওয়ার ঝুঁকি বেশি
যাদের বিভিন্ন ধরনের নেফ্রাইটিস আছে বা যারা ধীরগতিতে কিডনি রোগে ভুগছেন, তাদের গর্ভবতী হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মায়েদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি। গর্ভবতী অবস্থায় পূর্ববর্তী কিডনি রোগ বেড়ে যেতে পারে। কিডনির ওষুধ সেবনের জন্য বাচ্চার ক্ষতি সাধন হতে পারে, গর্ভপাতজনিত জটিলতা হতে পারে, কিডনিরোগ বেড়ে গিয়ে মা ও শিশুর মৃত্যু হতে পারে। কাজেই কারো পূর্ব থেকে কিডনি রোগ থেকে থাকলে তা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক গর্ভধারণ করতে পারেন। কারো যদি বাতজাতীয় কিডনি রোগ থাকে তবে চিকিৎসা করে কমপক্ষে ৬ মাস রোগ নিষ্ক্রিয় থাকার পর কিডনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মোতাবেক গর্ভধারণ করতে পারেন। যদিও এতে ঝুঁকি থেকেই থাকে।

বংশগত উচ্চরক্তচাপ বা ইজেনশিয়াল হাইপারটেনশন
যাদের পূর্ব থেকে উচ্চ রক্তচাপ ছিল, গর্ভাবস্থায় তা বেড়ে যেতে পারে- তাই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। গর্ভাবস্থায় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের সময় মনে রাখতে হবে অনেক ওষুধ আছে যা ভ্রুণের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক। কাজেই যত্রতত্র প্রেসারের ওষুধ ব্যবহার করা যাবে না। মিথাইল ডোপা, ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকার ও কিছু বিটা ব্লকার জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। উরঁৎবঃরপং বা প্রস্রাব বাড়ানোর ওষুধ অঈঊ ইনহিবিটর জাতীয় ওষুধ শিশুর ক্ষতিসাধান করতে পারে। মেয়েদের প্রস্রাবের নালির মুখ প্রজনন অঙ্গ ও পয়নালির খুব কাছাকাছি। তাই জীবাণু সহজেই এসব স্থান থেকে প্রস্রাবের রাস্তায় সংক্রামিত হতে পারে। আবার যৌনাঙ্গেন সাথে থাকাতে স্বামী সহবাসে মূত্রনালী আহত হতে পারে এবং সংক্রামিত হয়ে প্রস্রাবে প্রদাহ হতে পারে। বিশেষ করে নববিবাহিত মেয়েদের এই ধরনের ইনফেকশন বেশি হয়ে থাকে। এদেরকে বলা হয় ‘হানিমোন সিস্‌টাইটিস’। অনেক সময় কারো জরায়ু নিচে নেমে আসে এতে করে কিছু প্রস্রাব করার পরও থলেতে প্রস্রাব থেকে যায়। বিশেষত যে মায়ের অনেক সন্তান ও অপ্রশিক্ষিত দাই দ্বারা ডেলিভারি করানো হয়েছে, এদের এসব কারণে প্রস্রাবে প্রদাহ বেশি হয়ে থাকে। তাছাড়া গর্ভবতী অবস্থায় প্রস্রাবে ইনফেকশনের হার অনেকগুন বেড়ে যায়। অনেক সময় কোন উপসর্গ ছাড়াই ইনফেকশন হতে পারে। গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে ইনফেকশন কিডনির অনেক ক্ষতি সাধন করতে পারে, তাই বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে গুরুত্বসহকারে এর চিকিৎসা করতে হবে। প্রস্রাবের সময় জ্বালা পোড়া, ঘন ঘন অল্প অল্প প্রসাব, প্রস্রাব করার পরও প্রস্রাবের ইচ্ছে থাকা, তলপেটে ও কোমরের দুই পারে পেছনে ব্যথা, কখনও কাপুনি দিয়ে জ্বর আসা, প্রস্রাব দুর্গন্ধযুক্ত, ঘোলা কখনও রক্তমাখা ইত্যাদি প্রস্রাবের প্রদাহের প্রধান লক্ষণ।

মনে রাখতে হবে, কারো যদি প্রস্রাবে প্রদাহ সন্দেহ করা হয়-প্রস্রাব ল্যাব টেস্ট কালচার না পাঠিয়ে কখনও জীবানুনাশক ওষুধ খাবেন না। এতে কোন জাতীয় জীবাণু দ্বারা ইনফেকশন হয়েছে এবং কোন ওষুধে কাজ করবে তা নির্ধারণে মারাত্মক সমস্যা হতে পারে।

আর একটি সমস্যা আমরা প্রায়ই পেয়ে থাকি। তা হল গর্ভপাতজনিত জটিলতার কারণে আকস্মিক কিডনি ফেউল্যুর। আমাদের দেশে প্রায়ই দেখা যায় গ্রামের দাই-দের মাধ্যমে অবৈজ্ঞানিক উপায়ে গর্ভপাত ঘটানো হয়। এর ফলে জরায়ুতে ইনফেকশন হয়, পরে রক্তে ছড়ায় এবং মারাত্মক সেপটিসিমিয়া হয়ে কিডনি ফেইল্যুর হয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসা না পেলে মৃত্যু অনিবার্য হয়। তাই কোন ক্রমেই অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গর্ভপাত ঘটানো উচিৎ নয়।

পরিশেষে আবার শাকিলার কথাই বলি। আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যে আলামত পেয়েছি, একে বলে ঐবষঢ় ঝুহফৎড়সব যেখানে লিভার অসুস্থ হয়, রক্ত ভেঙ্গে যায়, রক্তশূণ্যতা দেখা দেয়, সাথে কিডনির কার্যকারিতা লোপ পায়। এর কারণ এখনও জানা যায়নি। আবার অনেক মায়েদের আরও জটিল সমস্যা হতে পারে। যেমন: হঠাৎ করে রক্ত জমাট বাধা, পরে রক্তক্ষরণ ও কিডনি ফেউল্যুর।

এতসমস্ত সমস্যা হাসিমুখে মেনে নিয়েও মায়েরা সন্তানের জন্ম দেয়। লালন করে, জীবন দিয়ে ভালবাসে। এ জন্যই ইসলামের মহান শিক্ষা-‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্‌ত’।


কিডনি রোগীরা যা খাবেন না


পানি খেতে হবে পরিমিত। প্রতিদিনের পস্রাবের পরিমানের ওপর নির্ভর করবে কতটুকু পানি রোগী খেতে পারবেন।
০ কিডনি রোগী মাছ, মাংস, দুধ, ডিম প্রভৃতি প্রাণীজ আমিষ সীমিত পরিমাণে খাবেন। রোগীর রক্তের ক্রিয়েটিনিন, শরীরের ওজন, ডায়ালাইসিস করেন কিনা, করলে সপ্তাহে কয়টা করেন তার ওপর নির্ভর করবে প্রতিদিন কত গ্রাম প্রোটিন খাবেন তার পরিমাণ।
০ উদ্ভিজ প্রোটিন বা দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রোটিন যেমন-ডাল, মটরশুটি, সিমেরবীচি যে কোন বীচি ডায়েট চার্টে থাকবে না।
০ যে সমস্ত- সবজি খাবেননা: ফুলকপি, বাধাকপি, গাজর, ঢেঁড়শ, শিম, বরবর্টি, কাঠালের বীচি, শীমের বীচি, মিষ্টি কুমড়ার বীচি, কচু, মূলা এবং পালং, পুঁইশাক ইত্যাদি।
০ ফলের ক্ষেত্রেও আছে নানান রকম নিষেধাজ্ঞা। প্রায় সব ফলেই সোডিয়াম পটাশিয়ামের আধিক্য আছে বলে কিডনি রোগীদের জন্য ফল খাওয়া একটা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। বিশেষ করে আঙ্গুর, কলা, ডাবের পানি। অল্প পরিমাণে আপেল এবং পেয়ারা তুলনামূলক নিরাপদ।







বিকল কিডনির জন্য ডায়ালাইসিস

আমাদের শরীরের কোনো অঙ্গ বা প্রত্যঙ্গ যতক্ষণ না স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিঘ্ন ঘটায়, সে পর্যন্ত সাধারণত আমরা সেটির কার্যক্রম জানতে পারি না। সেই প্রত্যঙ্গের কার্যকরতা বিঘ্নিত হলে কারণটি অপসারণের চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থা নিতে হয়। এ রকম একটি প্রত্যঙ্গ হচ্ছে কিডনি। শরীরের নিম্নাঙ্গের অভ্যন্তরে পিঠের দিকে বাঁ ও ডান পাশে কিডনি দুটির অবস্থান। এই কিডনির কার্যকরতা নানা কারণে বিঘ্নিত হতে পারে। কার্যকরতা অবাধ রাখার জন্য যে চিকিৎসাভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, তাকে বলা হয় ডায়ালাইসিস।

কার্যকরতা
প্রথমে সবাইকে জানতে হবে দুই কিডনির প্রয়োজনীয়তা বা শরীর যন্ত্র চালু রাখতে ডায়ালাইসিসের কী ভূমিকা রয়েছে। কিডনির কাজ হচ্ছে: ১. আমাদের শরীরে খাবার গ্রহণের পর যেসব বর্জ্য পদার্থ জমা হয় সেগুলোকে রক্তপ্রবাহ থেকে আলাদা করে বা ছেঁকে মূত্রথলিতে পাঠানো, ২. পরিষ্কার করার পর বিশুদ্ধ রক্তকে পুনরায় শরীরে সঞ্চালনের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রত্যঙ্গে পাঠানো, ৩. শরীরে রক্তস্বল্পতার কারণ দূর করা, ৪. শরীরে প্রয়োজনীয় উপাদান এসিডের ভারসাম্য রক্ষা করা। এই এসিড শরীরে রক্তের সব উপাদানের কার্যকরতা বজায় রাখে।

কিডনি অকার্যকর হওয়ার কারণ
১. রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত হলে, ২. বহুমূত্র রোগ নিয়ন্ত্রণ করা না হলে, ৩. ত্রুটি, ৪. কিছু ওষুধের বিশেষ করে যন্ত্রণানাশক ওষুধের অবারিত ব্যবহার, (৫) মূত্রনালির প্রদাহজনিত সংক্রমণ।

অকার্যকরতার লক্ষণ
১. উচ্চ রক্তচাপের অনুভূতি, যেমন মাথা ধরা, ঘাড়ব্যথা, মাথা ঘোরানো, খিটখিটে মেজাজ ইত্যাদি; ২. বমির ভাব ও বমনোদ্রেক; ৩. তলপেট ও কোমরে ব্যথা; ৪. মাথা ঝিমঝিম করা; ৫. সাধারণভাবে শারীরিক দুর্বলতার অনুভূতি; ৬. নিঃশ্বাস গ্রহণে অসুবিধা; ৭. পায়ে ও মুখে পানি জমা হয়ে ফুলে যাওয়া; ৮. বারবার প্রস্রাবের বেগ।
চিকিৎসা
লক্ষণগুলো দেখা গেলে অবিলম্বে একজন কিডনি বিশেষজ্ঞ বা নেফ্রোলজিস্টের পরামর্শ নিতে হবে। রক্তচাপ ও বহুমূত্র রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। সুষম খাদ্যাভ্যাস করতে হবে। বিশেষ করে আমিষযুক্ত ও তৈলাক্ত খাবার কম খেতে হবে। নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কিডনির কার্যকরতা পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন সময় রক্ত ও প্রস্রাব অন্তত বছরে একবার নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।

চিকিৎসা পদ্ধতি
কিডনির কার্যকরতা বিনষ্ট বা বিঘ্নিত হলে ডায়ালাইসিস করতেই হবে। ডায়ালাইসিস হচ্ছে কৃত্রিম উপায়ে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে রক্ত বিশুদ্ধ করা। ডায়ালাইসিস করা একবার শুরু হলে জীবনভর চালু রাখতে হবে। এই ডায়ালাইসিস পদ্ধতি ব্যয়বহুল এবং আমাদের দেশে সহজলভ্য নয়। একটি সমীক্ষায় জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ ব্যক্তি কিডনির নানা পর্যায়ের অকার্যকরতার কারণে অসুস্থ। অথচ তাদের প্রধান চিকিৎসা ডায়ালাইসিস সুবিধা পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে মাত্র ৪১টি ডায়ালাইসিস সেবাদানকারী কেন্দ্রে। এসব কেন্দ্রে সর্বাধিক বছরে মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার রোগী ডায়ালাইসিস চিকিৎসা নিতে পারে। তাও আবার ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে সবার পক্ষে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব নয়। এ ছাড়া দেশে কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ যাঁরা যথাযথ চিকিৎসা ও সময়মতো ডায়ালাইসিসের পরামর্শ দিতে পারেন, তাঁদের সংখ্যাও নগণ্য। বস্তুত প্রয়োজনের এক-দশমাংশ।
ডায়ালাইসিস একটি বিশেষ চিকিৎসা ব্যবস্থা। যা শুধু যথার্থ ও সঠিকভাবেই করতে হবে। এ জন্য একটি ডায়ালাইসিস কেন্দ্রে আধুনিক ও সঠিক চিকিৎসার যন্ত্রাদি থাকতে হবে। শিক্ষিত ও ডিপ্লোমাধারী নার্সের মাধ্যমে ডায়ালাইসিস দিতে হবে। চিকিৎসাকেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণের জন্য ডায়ালাইসিস ও কিডনি রোগ চিকিৎসায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক থাকতে হবে। কেন্দ্র হতে হবে স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। ডায়ালাইসিসের জন্য দেশে বেশ কিছু সেবাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। তবে যে কেন্দ্রে রোগীর ডায়ালাইসিস করানো হবে, সে কেন্দ্র সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজখবর নিতে হবে।
সবশেষে বলা প্রয়োজন, ডায়ালাইসিস গ্রহণকারী ও তার পরিসেবাকর্মীদেরও চিকিৎসাকালে ও পরবর্তী সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জীবনযাপন করতে হবে। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে, ডায়ালাইসিস গ্রহণ সঠিক না হলে, অপচিকিৎসা হলে শেষ পর্যন্ত কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হবে। আমাদের দেশে এখনো প্রতিস্থাপন ব্যবস্থা সঠিক ও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। তা ছাড়া দু-একটি প্রতিষ্ঠানে এ ব্যবস্থা থাকলেও তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।




কিডনির সমস্যা হলে রোগের শেষ নেই


হৃদযন্ত্র ও অন্যান্য দেহযন্ত্র নিয়ে যত কথা হয়, কিডনি নিয়ে তত কথা হয় না, শরীরের নানা কাজে এদের অবদান যে কত, ভাবা যায় না।
শরীর সুস্থ রাখার জন্য কিডনির ভূমিকা অনস্বীকার্য। যদিও শরীরের নানা জঞ্জাল ও বাতিল তরল কিডনি বের করে দেয়। কিডনি ঠিকমতো কাজ না করলে বিষাক্ত জিনিস শরীরে জমে জমে অসুস্থ হয় হূদযন্ত্র ও ফুসফুস। শরীরে পানি জমে, হয় শ্বাসকষ্ট। আমাদের শরীরে রয়েছে দুটো কিডনি। শিমের বীচির মতো দেখতে, ওজন ১৫০ গ্রাম, আয়তনে ১২x৫ সেন্টিমিটার। পিঠের মাঝখানে পাঁজরের খাঁচার নিচে এদের অবস্থান। প্রতিটি কিডনি অনেকগুলো খুবই ছোট, অথচ জটিল একক নিয়ে গঠিত, এই এককের নাম হলো ‘নেফ্রোন’। প্রতিটি নেফ্রোনের কাজ হলো প্রস্রাব তৈরি করা আর এভাবে রক্ত থাকে বিষমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন।
স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিন ২০০ লিটার পানি কিডনি দিয়ে পরিশ্রুত হয়, তবে মাত্র দুই থেকে তিন লিটার প্রস্রাব বেরিয়ে যায় দৈনিক; প্রস্রাবে থাকে বর্জ্য ও অম্ল।
শরীরের যা অপ্রয়োজনীয়, কিডনি তা বের করে দেয় অথচ শরীরে ফিরিয়ে দেয় এমন সব জিনিস, যা শরীরের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় জিনিস বাছাই করে শরীরের জন্য সংরক্ষণ করার এ কাজে কিডনির জুড়ি নেই। এ ছাড়া আরও কাজ আছে। কিডনি শরীরকে লোহিত কণিকা তৈরির কাজে সহায়তা করে। নিয়ন্ত্রণ করে রক্তচাপ। ভিটামিন ‘ডি’ সক্রিয়রূপে পরিণত হয় কিডনিতেই। আর এ জন্য কিডনির কল্যাণে হাড় থাকে মজবুত। শরীরে অম্ল ও ক্ষারের সমতা রক্ষায় কিডনির ভূমিকা রয়েছে।
লোহিত কণিকা গঠনে কিডনির ভূমিকা নিয়ে আরও বিস্তারিত বলি।
কিডনি, লোহিত কণিকা গঠন, রক্তচাপ ও সুস্থ হাড়—এদের মধ্যে পরস্পর সম্পর্ক বেশ জটিল।
কিডনি থেকে তৈরি হয় একটি হরমোন, যার নাম হলো ‘ইরিথ্রোপয়টিন’। এই হরমোন অস্থিমজ্জাকে উদ্দীপিত করে লোহিত কণিকা গঠনের জন্য। কারও কিডনি বিকল হলে কিডনি থেকে তৈরি হয় না ইরিথ্রোপয়টিন। ফলে হাড় লোহিত কণিকা তৈরি করতে পারে না, আর রোগীর হয় রক্তশূন্যতা।
দ্বিতীয়ত, বয়স বেশি হলে, ৪০ পেরোলে, লবণ কম খেতে হয়, যাতে রক্তচাপ থাকে সীমার মধ্যে।
কিডনি বাড়তি লবণ মোকাবিলা করতে পারে না, আর তাই বেশি লবণ খেলে বেশি পানি শরীরে থেকে যায় আর তাই রক্তচাপ যায় বেড়ে। বাড়ে শরীরের তরল। সুস্থ হাড়ের জন্য চাই সুস্থ কিডনি।
ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন ডি ও প্যারাথাইরয়েড হরমোনের একটি জটিল সমন্বয় ও কাজকর্মকে মোকাবিলা করে কিডনি। হাড় থাকে সুস্থ ও সবল।
কিডনি বিকল হলে এই সমন্বিত কাজকর্মে বিঘ্ন ঘটে, আর তখন হাড় হয়ে পড়ে ভঙ্গুর।
কিডনি-সমস্যার মূল কারণ কী কী তাহলে?
তালিকার প্রথমে রয়েছে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ না করলে কিডনির হয় অনেক ক্ষতি, আর একটি কথা—যাদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে তাদের তেমন উপসর্গ থাকে না।
দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশে ডায়াবেটিস এত বেশি আর উপসর্গও তেমন হয় না, সে জন্য অনেক রোগী আসে ডায়াবেটিসের কারণে কিডনি রোগ নিয়ে। ইতিমধ্যে ডায়াবেটিস কিডনির ক্ষতি করতে শুরু করেছে, আর বিকল হওয়ার পথে কিডনির যাত্রাও শুরু হয়েছে। কিডনি রোগের আরেকটি কারণ হলো সংক্রমণ ও প্রদাহ। বড় কারণ হলো ই.কোলাই নামের জীবাণুর সংক্রমণ। ই.কোলাই ব্যাকটেরিয়া এমনিতে থাকে পাচকনলে, মেয়েদের মূত্রনালিপথে এরা চলে যায়, যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের ভোগান্তি অনেক। এই ব্যাকটেরিয়া তখন উঠতে থাকে ওপর দিকে। শিশু ও বৃদ্ধলোক যাদের মূত্রপথে থাকে অবরোধ, তাদেরও সে রকম সংক্রমণ হতে পারে।
প্রদাহ হওয়ার অনেক কারণ অজানা। তবে ভাইরাস সংক্রমণ এবং অনেক অটোইম্যুন রোগ ঘটাতে পারে প্রদাহ।
কিডনি পাথুরি হলেও কিডনি পরে অসুস্থ হতে পারে।
কিডনি রোগ প্রতিরোধ বড় জরুরি। সংক্রমণ, প্রদাহ, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের জন্য কিডনিতে একবার ক্ষত হলে একে খণ্ডানো কঠিন, এ চলতেই থাকে সামনের দিকে।
কিডনি এক বিস্ময়কর যন্ত্র। একটি নয়, আমাদের রয়েছে দুটো কিডনি। প্রচলিত কথা ‘One to care and one to share’। মাত্র একটি কিডনি দিয়েও জীবনধারণ সম্ভব।
পৃথিবীতে অসংখ্য লোক রয়েছেন, যাঁরা স্বজনদের বা অন্যদের একটি কিডনি দান করে বেশ সুস্থ আছেন দীর্ঘদিন।
তবে কিডনি যখন অসুস্থ হয়, দুটোরই ক্ষতি হয়। কোনো টিউমার বা অবরোধ বা পাথুরি, যা একটি কিডনিতে সীমাবদ্ধ। সে ক্ষেত্রে ছাড়া অন্যান্য রোগে দুটো কিডনিতেই রোগের প্রভাব পড়ে।

প্রতিরোধক ধাপ
 রক্তচাপ নিয়মিত মাপাবেন।
 মাঝেমধ্যে রক্তে ক্রিয়েটিনিন মান মাপাবেন। (কিডনি কত ভালো কাজ করছে, এর একটি সূচক হলো কিয়েটিনিন)
 পারিবারিক চিকিৎসকের পরামর্শমতো নির্ভরযোগ্য ল্যাবে প্রস্রাব ও রক্তের সম্পূর্ণ পরীক্ষা করাবেন। তাহলে ডায়াবেটিস ও অন্যান্য সমস্যা থাকলে আগে ধরা পড়বে।
 বেশি ওজন, স্থূলতা ও জীবনযাপনের রোগগুলো এড়াতে ব্যায়াম করতে হবে নিয়মিত।
 ফাস্টফুড, হিমায়িত খাবার, আচার, পাপড়, অন্যান্য নোনা খাবার বর্জন করতে হবে।
 আচার যত কম খাওয়া যাবে, তত ভালো। হয়তো মাসে, দুই মাসে এক দিন।
 কিডনি রোগের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে চেকআপ আগে শুরু করতে হবে এবং নিয়মিত।
 প্রচুর পানি পান করতে হবে, যাঁরা ঘরের বাইরে রোদে কাজ করেন, তাঁরা পান করবেন অনেক বেশি।
 খাদ্যে লবণ কম খেলে বেশির ভাগ ক্যালসিয়াম পাথুরি রোধ করা যায়।
 নারীদের গোপনাঙ্গ সামনে থেকে পেছন দিকে ধুতে হবে, তা না হলে পাচকনলের ই.কোলাই জীবাণু মলদ্বার থেকে মূত্রপথে প্রবেশ করতে পারে।




কিডনি সুরক্ষা করুন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন

এবারের বিশ্ব কিডনি দিবস বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে আসছে।
ইন্টারন্যাশনাল নেফ্রোলজি সোসাইটি (আইএসএন) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব কিডনি ফাউন্ডেশন (আইএফকেএফ) যুক্তভাবে এ দিবসটি পালনের আয়োজন করছে।
বিশ্ব কিডনি দিবস পালনের উদ্দেশ্য হলো, আমাদের সার্বিক স্বাস্থ্যরক্ষায় কিডনির গুরুত্ব এবং বিশ্বজুড়ে কিডনি রোগের প্রভাব এবং আনুষঙ্গিক স্বাস্থ্যসমস্যা হ্রাস করার ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া ও সচেতনতা বাড়ানো।
* বিস্ময়কর দুটো কিডনি সম্পর্কে জনগণকে জানানো।
* ক্রনিক কিডনি রোগের পেছনে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ যে প্রধান ঝুঁকি, তা জোরালোভাবে উপস্থাপন করা।
* ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ যাদের আছে, তাদের ক্রনিক কিডনি রোগের চিহ্ন আছে কি না, তা স্ক্রিনিং করে দেখা।
* প্রতিরোধমূলক আচরণকে উত্সাহিত করা।
* ক্রনিক কিডনি রোগ (সিকেডি) নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় ও রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা।
আগাম চিহ্নিত হলে ক্রনিক কিডনি রোগকে চিকিৎসা করে ভালো করা যায়। হ্রাস করা যায় অন্যান্য জটিলতা। বিশ্বজুড়ে ক্রনিক কিডনি রোগ ও হূদরোগে মৃত্যু ও অক্ষম অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।
দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর পাঁচ শতাংশের কোনো না কোনো কিডনি রোগ রয়েছে। প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষের ক্রনিক কিডনি রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হূদরোগ ও রক্তনালি রোগে অকালমৃত্যু ঘটে।
ক্রনিক কিডনি রোগের সচরাচর কারণগুলোর মধ্যে আছে কিডনির প্রদাহ, মূত্রপথে অবরোধ, বংশপরম্পরায় রোগ। তবে উন্নত ও উন্নয়নশীল দুই বিশ্বেই ক্রনিক কিডনি রোগ, বিশেষ করে বয়স্কদের মধ্যে দেখা যায়। এর মূল কারণ হলো, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ। হূদরোগেরও মূল কারণ এ দুটি সমস্যা।
ক্রনিক কিডনি রোগ শনাক্ত না হয়ে থাকলে প্রথম পরিণতি হলো কিডনির কাজকর্ম ক্রমান্বয়ে নষ্ট হয়ে যাওয়া, পরে এভাবে চলতে থাকলে ডায়ালাইসিস, এমনকি কিডনি প্রতিস্থাপনও প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়া হূদরোগে অকালমৃত্যুও হতে পারে।
দেহের বিস্ময়কর যন্ত্র এ কিডনি। কিডনির মূল কাজ হলো মূত্র তৈরি করা ও রক্ত থেকে বর্জ্য ও বিষ শরীর থেকে অপসারণ করা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, লোহিত কণিকা তৈরি করা, হাড়কে মজবুত রাখা। মুষ্টির আয়তন এ যন্ত্রের আশ্রয় পেটের গভীরে, পাঁজরের খাঁচার নিচে।
কত যে কাজ করে কিডনি! রক্ত থেকে খনিজ, বিপাকদ্রব্য পরিষ্কার করে বের করে দেয় মূত্রের সঙ্গে বাইরে।
বিশ্বজুড়ে ২৮ কোটি মানুষেরও বেশি রয়েছে ডায়াবেটিস। এভাবে চলতে থাকলে ২০২৫ সালের মধ্যে ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা ৩৮ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। অনেকের অনুমান, ৪৪ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। জনসংখ্যা বিস্ফোরণ, নগরায়ণ, বসে বসে দিন কাটানো জীবন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা এসব কারণে বাড়ছে ডায়াবেটিস। ২০২৫ সালের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এমন ঘটবে মধ্যপ্রাচ্যে, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ও আফ্রিকায়। বিশ্বজুড়ে ৫০ শতাংশ মানুষ জানে না যে তাদের ডায়াবেটিস রয়েছে। প্রায় ৪০ শতাংশ ডায়াবেটিক রোগীর ক্রনিক কিডনি রোগ হয়ে যায়। স্থূলতাও বাড়ছে, এ জন্য ডায়াবেটিস ও ক্রনিক কিডনি রোগের আশঙ্কা বাড়ছে। পারিবারিক ইতিহাস, শরীরচর্চা না করা, উচ্চ রক্তচাপ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বড় ঝুঁকি। যেসব ঝুঁকি আয়ত্তে আনা সম্ভব, সেগুলো হ্রাস করলে ডায়াবেটিস ও ক্রনিক কিডনি রোগের আশঙ্কা কমে, কমে হূদরোগ হওয়ার আশঙ্কাও।
বিশ্বজুড়ে মানুষের মধ্যে বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপ। ক্রনিক কিডনি রোগের এটি হলো বড় কারণ। বিশ্বজুড়ে বৃদ্ধলোকের সংখ্যা বাড়ছে এবং উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও ক্রনিক কিডনি রোগের পেছনে একটি কারণ হলো বার্ধক্য। বুড়ো বয়সের লোকের এসব বেশি হয়।
পৃথিবীজুড়ে প্রায় ১০০ কোটি লোকের রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ। ২০২৫ সালে তা হতে পারে ১৫৬ কোটি। উন্নত দেশগুলোতে উচ্চ রক্তচাপ বাড়বে ২৪ শতাংশ।
তাই এ রোগ আগাম শনাক্ত করা জরুরি। বিশ্ব কিডনি দিবসে যাদের ঝুঁকি রয়েছে, এদের সবাইকে চেকআপ করানোর আহ্বান জানানো হচ্ছে। মানুষকে কিডনির সহজ টেস্টগুলো করিয়ে নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। কিডনি রোগের ঝুঁকি যাদের রয়েছে, তাদের জন্য স্ক্রিনিং খুব জরুরি। কিডনি রোগ থাকলে আগাম নির্ণয় খুব গুরুত্বপূর্ণ, এতে কিডনির ক্ষতি হওয়ার আগেই চিকিৎসা দেওয়া যাবে।
কিডনি রোগ হয় ধীরে ধীরে এবং শেষ পর্যায়ে যখন কিডনি বিকল হওয়ার পথে, তখন হয়তো লক্ষণ-উপসর্গ দেখা দেয়। তখন হয়তো ডায়ালাইসিসের পর্যায়ে। এমন অবস্থায় জীবনাচরণ হয়ে পড়ে জটিল, স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও ব্যয়ের চাপ পড়ে।
মূত্রের রুটিন পরীক্ষা। মূত্রের এলবুমিন ও সুগার, রক্তের ক্রিয়েটিনিন, রক্তচাপ, রক্তের সুগার পরীক্ষা করে কিডনি রোগের আগাম সংকেত পাওয়া যেতে পারে। ল্যাবরেটরি টেস্ট করাতে সামান্য রক্ত ও প্রস্রাব প্রয়োজন হয়। কিডনির সমস্যা হলে প্রস্রাবে পাওয়া যাবে এলবুমিন। ক্রমেই বেড়ে যাবে ক্রিয়েটিনিন। গ্লুমেরুলার ফিলট্রেশন রেট (জিএফআর) কমতে থাকে, প্রতি মিনিটে ১০০ মিলিলিটার থেকে কমে ৬০-এর নিচে, শোচনীয় হলে ১৫-এর নিচে।




রশ্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া বা এনুরিয়া (Anuria)


এনুরিয়া বলতে বোঝায় ২৪ ঘন্টায় একদম প্রসাব বা মুত্র না হওয়া। এটা ভয়াবহ একটি পরিস্থিতি। এমনটি হলে প্রথমেই নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে সত্যিই কি গত ২৪ ঘন্টা ধরে তৈরী প্রসাব হয়নি নাকি প্রসাব মুত্রথলি বা ইউরিনারি ব্লাডারে জমে আছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এমন দেখা যায় যে রোগীর প্রসাব তৈরী হয়েছে কিন্ত বের হতে পারছেনা, এমন পরিস্থিতি কে এনুরিয়া বলা হয়না, বলা হয় ইউরিনারি রিটেনশন। মুত্র নালি দিয়ে ক্যাথেটার পরিয়ে দিলেই রিটেনশন দূর হয়ে যায়, কিন্ত এনুরিয়া হলে ক্যাথেটার পরালেও কোনো ইউরিন বা মুত্র আসেনা।

শরীরে খুব তীব্র মাত্রার পানি শুন্যতা দেখা দিলে (যেমন, তীব্র ডায়ারিয়া বা বমি হওয়া, প্রচুর রক্তপাত হওয়া, শরীরের ব্যাপক অংশ পুরে যাওয়া ইত্যাদি), হৃদপিন্ড অপরিমিত পাম্প করলে (কার্ডিওজেনিক শক), এনেসথেসিয়ার পার্শপ্রতিক্রিয়ায়, হাইপোক্সিয়া বা তীব্র অক্সিজেন শুন্যতায় বা ভুল গ্রুপের ব্লাড দিয়ে রিএকশন হলে বা কিছু অসুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় এমনটি হতে পারে। আবার মুত্রথলির আগে মুত্রের গতি পথের কোথাও পাথর, টিউমার বা এমন অন্য কোনো কারনেও এনুরিয়া হয়। এনুরিয়া খুব ভয়াবহ একটি রোগ, কোনো প্রকার দেরি না করে সাথে সাথেই এর চিকিৎসা শুরু করা উচিত। এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে একজন নেফ্রোলজিষ্ট বা কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেয়া জরুরী। কি কারনে এনুরিয়া হয়েছে তা নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করাতে হয় এবং তার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে এর চিকিৎসা দেয়া হয়। চিকিৎসা শুরু করতে দেরী হয়ে গেলে প্রায় সময়ই দুটো কিডনিই নষ্ট হয়ে যায় যা রোগীর অকাল মৃত্যুর কারন হয়ে দাঁড়ায়।


নেফ্রোটিক সিন্ড্রম (Nephrotic Syndrome)

কোনো রোগকে ঘিরে যখন অনেকগুলো উপসর্গ এক সাথে বিরাজ করে তাকে সিনড্রম বলা হয়। নেফ্রোটিক সিনড্রম কিডনির এমনই অনেক গুলো উপসর্গের সমন্বয় যা অনেক গুলো রোগের কারনে হতে পারে, কিন্ত উপসর্গগুলো সব সময় একসাথে থাকে আর এর চিকিৎসা পদ্ধতিও একই। তা হলে প্রশ্ন আসতেই পারে নেফ্রটিক সিনড্রম হলে কি হয়। আসলে কিডনির যে যে রোগে প্রসাবে প্রচুর প্রোটিন যায়, রক্তে প্রোটিনের মাত্রা অনেক কমে যায় আর কোলেস্টেরলের মাত্রা অনেক বেড়ে যায় এবং সেই সাথে সমস্ত শরীরে পানি জমে ফুলে যায় তাকে এক কথায় নেফ্রটিক সিন্ড্রম বলে।

এবার তাহলে জানা যাক কি কি কারনে এই সিনড্রম হতে পারে - একেতো কিডনির ছাকুনির মতো অঙ্গানু বা গ্লোমিউরুলাসের নানা প্রকার প্রদাহের কারনে এ রোগ হতে পারে, এছাড়া সমস্ত শরীর জুড়ে হয় যেমন এস,এল,ই(SLE); পি,এ,এন(PAN), ডায়াবেটিস, এমাইলয়ডোসিস এসব কারনেও এমনটি হতে পারে। এছাড়া ম্যালেরিয়া, হেপাটাইটিস ‘বি’, হৃদপিন্ডের এন্ডোকার্ডাইটিস জাতীয় ইনফেকশন, কিছু ক্যান্সার, কিছু অসুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এমনকি জন্মগত কারনেও নেফ্রটিক সিনড্রম হতে পারে।

এই সিনড্রম হলে মুখ-মন্ডল ও চোখের পাতা ফুলে ঢলঢলে হয়ে যায়, শরীরের সমস্ত স্থানে পানি জমে (যেমন পেটে পানি জমে এসাইটিস, বুকে জমে প্লুরাল ইফিউশান) শরীর ফুলে যায়, তবে এ রোগে রোগীর রক্তচাপ বা ব্লাড প্রেসার স্বাভাবিক থাকে। অনেক সময় এ রোগে রোগীর ইনফেকশন হবার হার বেড়ে যায়, থ্রম্বোএমবোলিজম হয় আবার কখনো কখনো রোগী শক (Hypovolumic shock) এও চলে যেতে পারে। এমন কিছু হলে রোগীকে সাথে সাথে কিডনি বিশেষজ্ঞ বা নেফ্রলজিষ্টের তত্ত্বাবধানে ভর্তি করিয়ে দেয়া উচিত। তিনি এ রোগের সঠিক কারন নির্ণয়ে প্রসাব ও রক্তের বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা, এক্সরে এবং কখনো কখনো এন্টিনিউক্লিয়ার ফ্যাক্টর এমনকি রেনাল বায়োপসিও করিয়ে থাকেন।

নেফ্রটিক সিনড্রম হলে রোগীকে লবন এবং তরল জাতীয় খাবার পরিমান কমিয়ে আনতে হয়, এক্ষেত্রে রোগী স্বাভাবিক মাত্রার প্রোটিন বা আমিষ জাতীয় খাবার খেতে পারেন। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীকে এন্টিবায়োটিক, ডাইরেটিক এবং ক্ষেত্র বিশেষে স্টেরয়েড জাতীয় অসুধ দেয়া হয়। নেফ্রটিক সিনড্রম কোনো সাদাসিধে রোগ নয়, তাই যে কোনো চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা না করিয়ে সব সময় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া উচিত। অপরিমিত চিকিৎসার কারনে রোগীর রেনাল ফেইলুর, রিকেট, পেরিটনাইটিস ইত্যাদি রোগ হবার সম্ভাবনা আছে।

রসাবে রক্ত যাওয়া বা হেমাচুরিয়া (Hematuria)


হেমাচুরিয়া বলতে প্রসাবে রক্ত যাওয়াকে বোঝায়। এই রক্ত যাবার কারনে প্রসাবের রঙ ঘোলাটে দেখা যায় এবং কখনো কখনো তা গোলাপি বর্ণ ধারন করে। একজন সুস্থ্য মানুষের প্রসাবের সাথে কোনো রক্ত বা রক্ত কনিকা যাবেনা এটাই স্বাভাবিক। অবশ্য পরিনত সুস্থ্য মেয়ে/মহিলাদের প্রসাবে শুধুমাত্র মাসিক ঋতু চক্রের সময় কিছু রক্ত কনিকা পাওয়া যাওয়াটা স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়া হয়।

হেমাচুরিয়া অনেক কারনে হতে পারে তবে প্রধানত এটা কিডনির এবং মুত্রনালির নানাবিধ সমস্যার কারনেই হয়ে থাকে। কিডনি এবং মুত্রথলিতে ইনফেকশন, পাথর, টিউমার, ক্যান্সার বা টিবি হলে প্রসাবে রক্ত কনিকা পাওয়া যেতে পারে, এছাড়া কিডনি কোনো কারনে আঘাত প্রাপ্ত হলে বা এ,জি,এন (AGN), পায়োলোনেফ্রাইটিস ইত্যাদি হলেও প্রসাবে রক্ত কনিকা পাওয়া যেতে পারে। তা ছাড়া ইউরেটার (Ureter) এবং ইউরেথ্রায় (Urethra) পাথর, টিউমার, ইনফ্লামেশন হলে এবং প্রষ্টেট গ্রন্থির ঘা অথবা ক্যান্সার হলেও হেমাচুরিয়া হতে পারে। কিডনির সমস্যার বাইরে রক্তজমাট বাধার সমস্যা (Bleeding disorder), এন্ডোকার্ডাইটিস, অস্বাভাবিক উচ্চ রক্ত চাপ (Malignant hypertension) এমনকি কিছু অসুধ সেবনের কারনেও হেমাচুরিয়া হওয়া সম্ভব।


কিডনি বিশেষজ্ঞগন হেমাচুরিয়ার জন্য প্রসাব ও রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা, কিডনির বিভিন্ন প্রকার এক্সরে (Plain, Contrast), আলট্রাসনোগ্রাম, সিস্টোস্কোপি (Cystoscopy), বায়োপসি ইত্যাদি পরীক্ষা করিয়ে রোগের কারন নির্নয় করেন এবং চিকিৎসা করেন। হেমাচুরিয়ার চিকিৎসা পুরোপুরি এর কারন এর উপর নির্ভর করে। প্রসাবে রক্ত যাওয়া একটি আশঙ্কাজনক উপসর্গ, তাই এই ধরনের সমস্যা দেখা দিলে অতি সত্ত্বর চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত



রেনাল ফেইলুর (Renal failure)


বৃক্ক বা কিডনির (kidney) কাজ মূলত চারটি।

১। মূত্র তৈরী ও তার মাধ্যমে শরীরের অপ্রয়োজনীয় বর্জ পদার্থ বের করে দেয়া,

২। শরীরের অতিরিক্ত পানি ও মৌল বের করে দিয়ে এদের ভারসাম্য রক্ষা করা,

৩। জরুরী কিছু হরমোন তৈরী করা এবং

৪। ভিটামিন ডি ও ক্ষুদ্র কিছু আমিষের বিপাক ঘটানো। কিডনি যখন প্রথম কাজ দুটি করতে ব্যর্থ হয় তখনরেনাল ফেইলুর হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়।

রেনাল ফেইলুর দুই প্রকার। এর মধ্যে যেটি এক্যুট (acute) বা হঠাৎ করে হয় তার তীব্রতা কম এবং সময়মতো সঠিক চিকিৎসা করলে পুরোপুরি ভালোও হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে যেটি অনেক দিন ধরে ধীরে ধীরে হয় এবং ক্রমাগত চলতেই থাকে তাকে ক্রনিক (chronic) রেনাল ফেইলুর বলে। আসলে দুটি কিডনিরই উল্লেখযোগ্য অংশ কোনো কারনে স্থায়ীভাবেনষ্ট হয়ে গেলে তখন ক্রনিক রেনাল ফেইলুর হয়, এ রোগে কিডনি তার কাজ করার চারটি ক্ষমতাই হারায়, আর তাই এই রোগের পরিণতি ও বেশ খারাপ।

ক্রনিক রেনাল ফেইলুর হলে রোগী খুব দুর্বল ও ক্লান্ত হয়ে যায়। রক্ত শূন্যতা দেখা দেয়া, অস্থি ক্ষয় হওয়া, উচ্চ রক্তচাপ,শ্বাসকষ্ট, প্রসাবে ইনফেকশন, মাসিক অনিয়মিত হওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি এই রোগের উপসর্গ হিসেবে দেখা দেয়।

এ রোগ হলে রক্তে ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন, পটাসিয়ামের মাত্রা বেড়ে যায়। তাই রক্ত পরীক্ষাসহ মূত্রের বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা এবং এক্সরে, আলট্রাসনোগ্রামসহ অন্যান্য পরীক্ষাও করা লাগতে পারে। নেফ্রলজিস্ট (nephrologist) বা কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানেই কেবল এই রোগের চিকিৎসা করানো উচিত।

এ রোগে পরিমিত পানি, আমিষ ও লবন খেতে হয়। এছাড়াও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রন, রক্ত শুন্যতা থাকলে তা দূর করণসহ নানারকম নিয়ন্ত্রনের মধ্যে থাকতে হয়। ক্রনিক রেনাল ফেইলুর কখনো চিরতরে ভালো হয়ে যায়না, চিকিৎসার এক পর্যায়েডায়ালাইসিস করার প্রয়োজন দেখা দেয়, এতেও যখন রোগ নিয়ন্ত্রন করা যায়না তখন কিডনি বদল বা রেনাল ট্রান্সপ্লান্টেশন (renal transplantation) করা অনিবার্য হয়ে পরে।












«
Next
Newer Post
»
Previous
Older Post

4 comments:

  1. আমার সম্পর্কে সত্যিকারের জীবন গল্প মিস নারায়ণ হাসপাতালে মিস মারিয়া প্যাট্রিকিয়াল এবং ডাঃরাজ, যিনি আমি আমার কিডনিতে একটি টাকার বিনিময়ে বিক্রি করেছিলাম এবং ট্রান্সপ্লান্ট হওয়ার কয়েকদিন আগে তিনি আমাকে কিছু পরিমাণ মূল্য (50 450,000,00 মার্কিন ডলার) দিয়েছিলেন, আমি ব্যবহার করেছি খুব দরিদ্র হতে এবং আমার পক্ষে খেতে অসুবিধা হয়, আমি এই বিষয়ে একটি সাক্ষ্য পেয়েছিলাম যে কীভাবে চিকিত্সক রাজ তার কিডনি দিয়ে একজন কেইন শনকে কিডনি দিয়েছিলেন, যে বলেছিল যে আগ্রহী কেউই এটিকে একটি ট্রায়াল দেয় এবং ফিরে আসে। সাক্ষ্য দিন, আমি (narayanahealthcare.in@gmail.com) হিসাবে ইমেলটি অনুলিপি করেছি এবং তিন ঘন্টারও কম সময়ে তাকে ডাক্তারের কাছ থেকে একটি উত্তর পেয়েছিলাম এবং আমরা দর কষাকষি করি এবং আমি একটি সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করি, প্রয়োজনীয় চুক্তি গ্রহণ করি, সমাধান করি সমস্ত ইস্যু, কয়েক দিনের মধ্যেই আমরা দু'জনেরই সম্মতি অনুসারে বেতন পেয়েছি এবং কোনও সমস্যা ছাড়াই রোগীকে বাঁচাতে আমার জন্য অপারেশন করার জন্য একটি তারিখ নেওয়া হয়েছিল এবং আমার ব্যালেন্সের অর্থ পেয়েছি, এখন আমি আর্থিকভাবে নিষ্পত্তি হয়েছি এবং দৃ firm়, দয়া করে হাসপাতালের সাথে যোগাযোগ করতে দ্বিধা করবেন না (নারায়ণহেলথ কেয়ার.কম @ gmail.c ওম) আমার আর্থিক সমস্যাটি জীবনে শেষ হয়েছে এবং এখন সুখী জীবনযাপন করছি। আল্লাহকে ধন্যবাদ

    ReplyDelete
  2. আমার সম্পর্কে সত্যিকারের জীবন গল্প নারায়ণ হাসপাতালে মিস মারিয়া প্যাট্রিকিয়াল এবং ডাঃরাজ, যিনি আমি আমার কিডনিতে একটি টাকার বিনিময়ে বিক্রি করেছিলাম এবং ট্রান্সপ্লান্ট হওয়ার কয়েকদিন আগে তিনি আমাকে কিছু পরিমাণ মূল্য (50 450,000,00 মার্কিন ডলার) দিয়েছিলেন, আমি ব্যবহার করেছি খুব দরিদ্র হতে এবং আমার পক্ষে খাওয়া আমার পক্ষে কঠিন মনে হয়, আমি কীভাবে ডাক্তার রাজের বিষয়ে কথা বলার একটি সাক্ষ্য পেয়েছি
             একজন কেইন শান তার কিডনি দিয়ে তাকে প্রচুর ক্ষতিপূরণ দিয়েছিলেন যিনি বলেছিলেন যে যে কেউ আগ্রহী তাকে এটি একটি পরীক্ষা দিতে হবে এবং সাক্ষ্য দিতে ফিরে আসবে, আমি ইমেলটি (narayanahealthcare.in@gmail.com) হিসাবে অনুলিপি করেছিলাম এবং তাকে তিনটিরও কম ইমেল করেছিলাম কয়েক ঘন্টা পরে আমি ডাক্তারের কাছ থেকে উত্তর পেয়েছিলাম এবং আমরা দর কষাকষি করি এবং আমি একটি সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করি, নিবন্ধন করি, সমস্ত প্রয়োজনীয় চুক্তি গ্রহণ করি, সমস্ত সমস্যা সমাধান করি, কয়েক দিনের মধ্যে আমার উভয়ের সম্মতি অনুসারে আমি বেতন পাই এবং অপারেশনের জন্য একটি তারিখ নেওয়া হয় এবং কোনও সমস্যা ছাড়াই রোগীকে বাঁচাতে আমার উপর অপারেশন করেছিলেন এবং আমার ব্যালেন্সের অর্থ পেয়েছি, আমি এখন আর্থিকভাবে স্থিতিশীল এবং দৃ firm় আছি, দয়া করে হাসপাতালের সাথে যোগাযোগ করতে এবং আপনার কিডনি বিক্রি করতে দ্বিধা করবেন না
     narayanahealthcare.in@gmail.com)
     আমার আর্থিক সমস্যাটি জীবনে শেষ হয়েছে এবং এখন সুখী জীবনযাপন করছি।

    ReplyDelete
  3. আমার সম্পর্কে সত্যিকারের জীবন গল্প মিস নারায়ণ হাসপাতালে মিস মারিয়া প্যাট্রিসিয়োভ এবং ডাঃরাজ, যিনি আমি আমার কিডনিতে একটি টাকার বিনিময়ে বিক্রি করেছিলাম এবং ট্রান্সপ্লান্ট হওয়ার কয়েকদিন আগে তিনি আমাকে কিছু পরিমাণ (৪৫০,০০০,০০০ ডলার) অর্থ দিয়েছিলেন, আমি ব্যবহার করেছি খুব দরিদ্র হতে এবং আমার পক্ষে খাওয়া আমার পক্ষে কঠিন মনে হয়, আমি কীভাবে ডাক্তার রাজকে নিয়ে কথা বলার একটি সাক্ষ্য পেয়েছি
               এক কেইন শান তার কিডনি দিয়ে তাকে প্রচুর ক্ষতিপূরণ দিয়েছিলেন যিনি বলেছিলেন যে যে কেউ আগ্রহী সেটিকে এটি একটি ট্রায়াল দিতে হবে এবং সাক্ষ্য দিতে ফিরে আসবে, আমি ইমেলটি (Lilavatihospital.in@gmail.com) হিসাবে অনুলিপি করে তাকে ইমেল করেছি তিন ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে আমি ডাক্তারের কাছ থেকে জবাব পেয়েছিলাম এবং আমরা দর কষাকষি করি এবং আমি সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করি, নিবন্ধন করি, সমস্ত প্রয়োজনীয় চুক্তি গ্রহণ করি, সমস্ত সমস্যা সমাধান করি, কয়েক দিনের মধ্যে আমার উভয়ের সম্মতি অনুসারে বেতন পেলাম এবং একটি তারিখ ছিল অপারেশনের জন্য নেওয়া হয়েছিল এবং কোনও সমস্যা ছাড়াই রোগীকে বাঁচানোর জন্য আমার উপর অপারেশন করে এবং আমার ব্যালেন্সের অর্থ পেয়েছি, আমি এখন আর্থিকভাবে নিষ্পত্তি এবং দৃ firm় আছি, দয়া করে হাসপাতালের সাথে যোগাযোগ করতে দ্বিধা করবেন না।
     এবং আপনার কিডনি এটি বিক্রি করুন (Lilavatihospital.in@gmail.com) আমার আর্থিক সমস্যাটি জীবনের শেষ হয়েছে এবং এখন আমি সুখী জীবনযাপন করছি।

    ReplyDelete
  4. লীলাবতী হাসপাতালে আপনাকে স্বাগতম আপনি kidney 700,000, এ আপনার কিডনি বিক্রি করতে চান? এটা কি তুমি
    টাকার বিনিময়ে তার কিডনি বিক্রি করার সুযোগ খুঁজছেন
    আর্থিক সঙ্কটের কারণে এবং আপনি কী করবেন তা জানেন না
    আজই আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন এবং আমরা আপনাকে একটি ভাল অফার করব
    আপনার কিডনি জন্য অর্থের পরিমাণ। আমার নাম লীলাবতী হাসপাতালে ডাক্তার দীপক পরীখ, আমাদের ক্লিনিকটি রেনাল সার্জারীতে বিশেষজ্ঞী এবং চিকিত্সা করছে
    ডোনারের সাথে সম্পর্কিত কিডনি ক্রয় এবং প্রতিস্থাপন
    আমরা ভারত, দুবাই, কুয়েতে অবস্থিত
    আপনি কিডনি বিক্রয় বা কেনার বিষয়ে আগ্রহী, না
    আমাদের সাথে ইমেল যোগাযোগ করতে দ্বিধা করবেন না।
    ই-মেইল: lilavatihospital.in@gmail.com


    কিডনি কিনে এমন বিশেষজ্ঞ হাসপাতাল লীলাবতী হাসপাতালে স্বাগতম!
    আপনি কি টাকার বিনিময়ে আপনার কিডনি বিক্রি করতে চান? যদি হ্যাঁ.
    তারপরে একটি নির্ভরযোগ্য এবং ভাল লেনদেন পেতে আজই যোগাযোগ করুন।
    অবিলম্বে নীচের তথ্য মাধ্যমে যোগাযোগ করুন
    ই-মেইল: lilavatihospital.in@gmail.com
    ধন্যবাদ

    ReplyDelete