রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে নিরাপত্তা পরিষদ কার্যকর পদক্ষেপ নিবে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বৈঠকের প্রাক্কালে বুধবার বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ তার প্রস্তাব দিয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী নগরীতে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সংকটের সমাধানে ইতোমধ্যেই পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন। আমরা তাঁর প্রস্তাবের আলোকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পরামর্শ পাঠিয়েছি।’
বাংলাদেশের উদ্বেগের সঙ্গে জাতিসংঘও ইতোমধ্যেই এ ঘটনাকে জাতিগত নিধন উল্লেখ করে এর নিন্দা জানিয়েছে এবং আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায় এ ঘটনাকে গণহত্যা বলে অভিহিত করেছে।
মাহমুদ আলী বলেন, ঢাকা সংঘাতময় পরিস্থিতি চায় না। কারণ বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত এসকল লোকের সুষ্ঠু প্রত্যাবাসন চায়। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি মিয়ানমার সরকার তাদের নাগরিকদের সুষ্ঠু প্রত্যাবাসনে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, যাতে তারা তাদের অধিকারের নিশ্চয়তাসহ নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় আয়োজিত এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন, সুইডেন, ইতালি, মিসর ও জাপানের রাষ্ট্রদূতগণ উপস্থিত ছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে এই মানবিক সংকটের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতিসংঘ সংস্থাটিকে আরো সচেতন করার বাংলাদেশের প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশসমূহের রাষ্ট্রদূতদের ব্রিফ করতে ডাকা হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৫টি সদস্য রাষ্ট্রের রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে আগামীকাল নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে রোহিঙ্গা ইস্যুতে অনুষ্ঠেয় নিরাপত্তা পরিষদের উন্মুক্ত আলোচনায় বাংলাদেশ বক্তব্য রাখবে। তিনি আরো বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের সকল সদস্য রাষ্ট্র রোহিঙ্গা ইস্যুতে সহানুভুতিশীল এবং বাংলাদেশের প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনা করব এবং আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা যেন নিরাপদে তাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে।
এর আগে গত মাসে সংকট শুরুর পর নিরাপত্তা পরিষদ দুই বার রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসে, তাছাড়া চলতি মাসের গোড়ার দিকে সংস্থাটি এই পরিস্থিতির নিন্দা এবং সহিংসতা বন্ধে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের প্রতি আহবান জানিয়ে বিবৃতি দেয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংকট নিরসনে গত সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পাঁচ দফা প্রস্তাব পেশ করেন।
এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অফিসের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী উ কিওয়াও টিন্ট সোয়ে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা আসবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে তার ঢাকা সফরের দিনক্ষণ এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
তিনি বলেন, মিয়ানমারের মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তার এই সফরটি বিলম্বিত হতে পারে। কারণ প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম. শাহরিয়ার আলম ও পররাষ্ট্র সচিব এম. শহিদুল হক এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে আজ সকালে ভারতের হাই কমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রীংলা ঢাকাকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে তার দেশ ‘মানবিক ও কূটনৈতিকভাবে’ বাংলাদেশকে সমর্থন করবে।
এর আগে আজ সকালে সফররত জাপানের পররাষ্ট্র বিষয়ক পার্লামেন্টারি ভাইস-মিনিস্টার আইওয়াও হোরি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম. শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এ সময় তাদের মধ্যে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই সংকটময় মুহূর্তে জাপান বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে দেশটির মন্ত্রী আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।’ গতকালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে ২৫ আগস্ট থেকে দেশটির রাখাইন রাজ্য থেকে প্রায় চার লাখ ৮০ হাজার মিয়ানমার নাগরিক বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে
রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ান : রাষ্ট্রপতি
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াতে সকল ধর্মের মানুষের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। তিনি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।
হিন্দু সম্প্রদায়ের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব দুর্গা পূজা উপলক্ষে বুধবার রাজধানীতে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ান। এই কঠিন সময়ে তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন।’
সাম্প্রতিককালে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, হিন্দুসহ রাখাইন রাজ্যের লাখ-লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, যারা রাখাইন রাজ্যে নিষ্ঠুর অত্যাচারের শিকার হয়েছেন।
আবদুল হামিদ বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের প্রতি আমাদের সহানুভূতিশীল হতে হবে। স্বদেশে তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন এবং তাদের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সকল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে।’
দুর্গাপূজাকে বাংলাদেশে একটি ‘সার্বজনীন উৎসব’ অভিহিত করে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, বন্যার কারণে হাওড় এবং দেশের অন্যান্য এলাকায় অনেক হিন্দু এবছর দুর্গাপূজা উদযাপন করতে পারছেন না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি সম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এখানে সব ধর্মের অনুসারিরা দীর্ঘদিন ধরে তাদের নিজ-নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপন করে আসছে। রাষ্ট্রপতি বলেন, এদেশে সবাই সমানভাবে ধর্মীয় উৎসব পালন করে থাকেন এবং এখানে কোনো ধরনের বৈষম্য ও সংঘাত নেই।
তিনি বলেন, ‘কিন্তু, মূল সমস্যাটি হচ্ছে, কিছু মানুষ ধর্মের মর্ম বোঝে না এবং এ কারণে সমগ্র মানবজাতিকে মূল্য দিতে হয়।
রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশ ও জনগণের কল্যাণে ধর্মীয় অথবা সমাজিক বিভাজনকারী এই অশুভ শক্তির হাত থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশকে সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে সবাইকে অবদান রাখতে হবে। সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় জঙ্গিবাদ, অসহিষ্ণুতা এবং মৌলবাদকে এড়িয়ে চলতে হবে।
তিনি বলেন, সরকার দেশ থেকে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস নির্মূলে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং ইতোমধ্যেই দেশবাসী এ ব্যাপারে সাফল্য প্রত্যক্ষ করছে।
এর আগে, রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি আরেকটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।
রাষ্ট্রপতি মৌলবাদী ও জঙ্গিদের মোকাবেলায় জাতীয় ঐক্য ও সংহতি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
রাষ্ট্রপতি ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির ও রামকৃষ্ণ মিশন পরিদর্শনকালে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ড. বীরেন সিকদার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন, হাজী সেলিম এমপি, কাজী ফিরোজ রশিদ এমপি, সাবেক সংসদ সদস্য মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ ও রাষ্ট্রপতির সচিবগণ উপস্থিত ছিলেন।
