নানা সমস্যায় দিন কাটছে মেহেরপুর তেরঘোরিয়া আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দাদের
-আবু লায়েছ লাবলু //
নির্মানের ১৭ বছর পরও সংস্কার না হওয়ায় সামনের দিনগুলো কিভাবে কাটবে তা নিয়ে সংসয় দেখা দিয়েছে মেহেরপুর সদর উপজেলার তেরঘোরিয়া আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দাদের। সময়ের দীর্ঘ সূত্রিতায় সংসারে লোকজন বাড়লেও বাড়েনি তাদের থাকার ঘর। আশ্রয়ন প্রকল্পে ৬শ’ লোকের বসবাসের এলাকায় নেই কোন সরকারি কবরস্থান। এছাড়া সেখানে রয়েছে আর্সেনিকমুক্ত পানির অভাব। সংস্কার করা প্রয়োজন বাথরুম ও চলাচলের রাস্তা। সরকারি নজরদারী না থাকায় নানা সমস্যা নিয়ে দিন কাটছে তেরঘোরিয়া আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দাদের।
দীর্ঘ ১৭ বছরে আশ্রয়ন প্রকল্পের লোকসংখ্যা বেড়েছে। বর্তমানে আশ্রয়ন প্রকল্পের লোক সংখ্যা প্রায় ৬শ’। যাদের মধ্যে ভোটার রয়েছেন ৩৭৫ জন। তেরঘোরিয়া আশ্রয়ন প্রকল্পের চেয়ারম্যান আবুল বাশার জানান, প্রকল্পের প্রত্যেক পরিবারের জন্য সরকার ৩০ শতক করে খাস জমি বন্দোবস্ত দেন। ২০০০ সালের বন্যার পর তেরঘোরিয়া প্রকল্পে প্রবেশের জন্য পাকা রাস্তা করে দেয়া হয়। এছাড়া আর্থিক সহযোগিতা হিসেবে ১০ হাজার টাকা করে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করে দেয সরকার। একই বছরে প্রকল্পের পাশের খাস জমির উপরে একটি কমিউনিটি সেন্টার ও একটি মসজিদ করে দেয়া হয়। এছাড়া প্রকল্পবাসীর জন্য একটি ৩ বিঘা ও দেড় বিঘা পুকুর দেয়া হয় প্রকল্পবাসীর গোসল করা ও মাছ চাষ করার জন্য। এছাড়া প্রতি ১০ টি করে পরিবারের জন্য ৪টি করে পায়খানা ও একটি করে আর্সেনিকমুক্ত টিউবওয়েল স্থাপন করে দেওয়া হয়।
সরেজমিনে তেরঘোরিয়া আশ্রয়ন প্রকল্পে গিয়ে এ সবের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। তবে এসবের অধিকাংশ নষ্ট হয়ে গেছে দেখা যায়। সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে জড় হন আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা জেহের আলী, খোদা বক্স, আব্দুল মান্নান, নায়েব আলী, দাউদ হোসেন, জমসের আলী, মূলুক চাঁদ, আব্দুল জব্বার, ইসমাইল হোসেন, শের আলী, আব্দুল মতিন, আব্দুল ওয়াদুদ, দাউদ আলী, মহিরউদ্দিন ও আজাহার আলীসহ অনেকে। তারা জানানেল নানা সমস্যার কথা। সুপেয় পানি সমস্যার কথায় তারা বললেন, ২০০২ সালে তাদের জন্য ৪টি আর্সেনিকমুক্ত টিউবওয়েল স্থাপন করে দেয়া হলেও তার মধ্যে ৩ টি নষ্ট হয়ে গেছে। মেরামত করার কোন উদ্যোগ নেই। আশ্রয়ন প্রকল্পের কাছে একটি বে-সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে তোলা হয়েছে(বর্তমানে সরকারি )। সেখানে ৪ জন শিক্ষক ও ১৮৫ জন শিক্ষার্থীর রয়েছে। এ স্কুলের শিক্ষকরা শিক্ষার আলো জ্বেলে গেলেও সরকারিভাবে সকল সুবিধা এখনো হয়নি।
১৭ বছর আগের তৈরি টিনের ঘেরা ও ছাউনি ব্যারাকে মরিচা ধরেছে। টিনের নাট-বোল্ট নষ্ট হয়ে গেছে। আশ্রয়ন প্রকল্পের রাস্তা কাঁচা হওয়ায় যাতায়াতের অসুবিধাও রয়েছে তাদের। পুকুর দু’টি দীর্ঘ দিনেও সংস্কার না হওয়ায় ময়লা মাটিতে ভরে গেছে। সরকারি সহযোগিতায় পাওয়া ১০ হাজার টাকার ব্যাংক ঋণে এখন আর কোন কাজ হচ্ছেনা। ব্যাংক ঋনের পরিমান বৃদ্ধি না করা হলে উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে জানালেন তারা। তারা পালি কলে গ্রাম পাহারা করে থাকেন। পাহারা বন্ধ করলে আশ্রয়ন প্রকল্পে চুরি-ডাকাতি হয়। ইতোপূর্বে এক-দু’দিন পরপর পুলিশ আসলেও এখন আর আসেনা এমন অভিযোগও করলেন তারা।
আশ্রয়ন প্রকল্পের পাশের বিজন বিলের উপর একটি ব্রীজ হলে আপাদে-বিপদে দ্রুত তেরঘোরিয়া গ্রামবাসীর সহযোগিতা তারা পেতেন এমন দাবি তাদের। এছাড়াও তাদের দাবি ঘর সংস্কার, প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন নির্মান ও পুকুর ২টি পুনঃখনন, স্থায়ী কবরস্থান, রাস্তা ও বাথরুম সংস্কার এবং নিরাপদ পানির।
শুধু এটাই শেষ নয়। আশ্রায়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা ষাটোর্ধ মর্জিনা জানালেন, এক যুগেরও বেশি সময় আগের পাওয়া ২০ ফুট দৈর্ঘের ও ৯ ফুট প্রস্থ্যের একটি কক্ষে বর্তমানে ৩ ছেলে ও এক নাতি নিয়ে কিভাবে বাস করা সম্ভব। ছেলেদের বিয়ে হয়েছে। ঘরে বউ এসেছে। এখন কষ্ট অনেক বেড়ে গেছে। আশ্রয়ন প্রকল্পের এমন অনেকের দাবি গত ১৭ বছরে সন্তান বেড়েছে; তারা বড় হয়েছে। কিন্তু কোন ঘর বাড়েনি।
তেরঘোরিয়া আশ্রয়ন প্রকল্পবাসীর অনেকের দাবি, পাশ্ববর্তী তেরঘোরিয়া খড়ের মাঠে প্রায় ৭শ’ বিঘা খাস জমি প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছে। সরকারি প্রচেষ্টায় ওই জমি উদ্ধার করে আশ্রয়ন প্রকল্পবাসীর মধ্যে বন্দোবস্ত দেয়া হলে ছেলে মেয়ে নিয়ে তাদের বসবাসের সমস্যা দূর হবে।
কুতুবপুর ইউপি চেয়ারম্যান সহিদ আলি জানান, তেরঘোরিয়া আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দাদের সমস্যার কথা বিবেচনা করে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে দ্রুত আশ্রয়ন প্রকল্পের রাস্তা ও পুকুর ২টি সংস্কার এবং সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়টির জন্য একটি ল্যাট্রিন ইতোমধ্যে করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের জন্য ভবন বরাদ্দ পাওয়া যায় তার জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
মেহেরপুর সদর উপজেলা নির্বাহী মিজানুর রহমান জানান, তেরঘোরিয়া আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দাদের সমস্যা আছে। তবে রঘুনাথপুর আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দাদের মত নয়। নানা সমস্যার কারণে রঘুনাথপুর আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দাদের অনেক পরিবার আশ্রয়ন প্রকল্প ছেড়ে গেলেও তেরঘোরিয়া আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দাদের সে ধরণের সমস্যা নাই। যে কারণে তাদের সকল পরিবারই বর্তমান আছেন। তার পরও তাদের সমস্যাগুলো সরকারিভাবে সমাধান হবে।
No comments: