Sponsor



Slider

বিশ্ব

জাতীয়

রাজনীতি


খেলাধুলা

বিনোদন

ফিচার


যাবতীয় খবর

জিওগ্রাফিক্যাল

ফেসবুকে মুজিবনগর খবর

» » » বৈদ্যুতিক বিবর্তনে মেহেরপুরে বিলুপ্ত গ্রামীণ হ্যাজাক, হারিকেন ও কুপি




বৈদ্যুতিক বিবর্তনে বিলুপ্ত গ্রামীণ হ্যাজাক, হারিকেন ও কুপি :হারিকেন হচ্ছে জ্বালানি তেলের মাধ্যমে বদ্ধ কাচের পাত্রে আলো জ্বালাবার ব্যবস্থা। এর বাহিরের অংশে অর্ধবৃত্তাকার কাচের অংশ থাকে যাকে বাঙালিরা চিমনি বলে থাকে, এর ভিতরে থাকে তেল শুষে অগ্নি সংযোগের মাধ্যমে আলো জ্বালাবার জন্য কাপড়ের সলাকা। আর সম্পূর্ণ হারিকেন বহন করবার জন্য এর বহিরাংশে একটি লোহার ধরুনি থাকে, আলো কমানো বা বাড়ানোর জন্য নিম্ন বহিরাংশে থাকে একটি চাকতি যা কমালে বাড়ালে শলাকা ওঠা নামার সাথে আলোও কমে ও বাড়ে। গ্রামাঞ্চলে এর ব্যবহার সর্বাধিক। অনেক কাল আগে থেকে এর ব্যবহার শুরু হয়, সম্ভবত মোঘল আমলের আগে থেকে বাংলায় শুরু হয় হারিকেনের ব্যবহার। তবে এখনো পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে রিক্সার নিচে আলোর উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয় এই হারিকেন।

এক সময় রাতের আঁধারে বিয়ে বাড়ি, জন্মদিন, ধর্মসভা, যাত্রাগান সহ গ্রামীণ সকল অনুষ্ঠানের আলোর একমাত্র উৎস ছিল এই হ্যাজাক লাইট যা কালের বিবর্তনে, বৈদ্যুতিক সাফল্যের কারণে আজ বিলুপ্তির পথে পুরনো ঐতিহ্যবাহী আলো দানকারী বস্তুটি। বিলুপ্ত প্রায় হারিকেন ও কুপি নামে আরো দুটি আলো দানকারী বস্তু। সবই চলত কেরোসিন তেলের মাধ্যমে। কুপির ব্যবহার কিছুটা এখনো পাওয়া যায় ক্রমাগত নদী ভাঙ্গনে চরাঞ্চলে নতুন নতুন বসতি গুলোতে যেখানে বিদ্যুতের আলো নদী ভাঙ্গনের সাথে পাল্লা দিয়ে পৌঁছতে পারেনা, সেসব বাড়িতে। এর সবগুলোই আজ নতুন প্রজন্মের কাছে যেন শায়েস্তা খাঁর আমলের ইতিহাসের মত। প্রত্যন্ত গ্রামবাংলার প্রায় অনেক ঘরেই থাকতো হ্যাজাক লাইট। বাড়িতে ছোট-বড় কোন অনুষ্ঠান হলে সকালবেলায় শুরু হত দৌড়-ঝাপ। সন্ধ্যেবেলায় আলো দেয়ার জন্য ব্যবহার হত এই হ্যাজাক লাইট, চলে তাকে জ্বালানোর প্রস্তুতি। সাধারণত সবাই এ বস্তুকে জ্বালাতে পারতো না। সেরকম বিশেষ ব্যক্তিকে সেদিন পরম সমাদরে ডেকে আনা হতো। সেদিন তাঁর চাল-চলন থাকতো বেশ দেমাগি। এই লাইট জ্বালানোর প্রস্তুতিটাও ছিল দেখার মত, অনেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতো তার কর্মযজ্ঞ, বাড়ির কচি-কাচারা এমনকি বড়রাও হ্যাজাক লাইট প্রজ্জ্বলন প্রস্তুতি দেখতে গোল হয়ে বসত। এরপর তিনি হ্যাজাকে তেল আছে কিনা পরীক্ষা করে নিয়ে শুরু করতেন পাম্প করা। একবার একটা পিন দিয়ে বিশেষ পয়েন্টে খোঁচাখুঁচি করা হত। তারপর একটা হ্যাজাকের নব ঘুরিয়ে কিছু জ্বলন্ত কাগজ তার সংস্পর্শে আনতেই দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠত। তখন শুরু হতো এই লাইটের গোড়ায় বিশেষ পদ্ধতিতে পাম্প দেওয়া। ক্রমেই হ্যাজাকের মাঝখানের ম্যান্টল থেকে বেশ উজ্জ্বল আলো বেরনো শুরু হত যা দেখতে প্রায়ই এখনকার বৈদ্যুতিক এলইডি বাল্ব এর আলোর মতো মনে হতো । আলো জলার সঙ্গে সঙ্গেই একটা বুকে কাপঁন ধরানো আওয়াজ তৈরি হত। আবার মাঝে মাঝে হ্যাজাকের ওপর দিয়ে দুম করে আগুন জ্বলে উঠত। আবার কখনও বা গোটাটাই নিভিয়ে যেত। সফলভাবে হ্যাজাক জ্বালানোর পর সেই ব্যক্তির মুখে ফুটে উঠত এক পরিতৃপ্তির হাসি। আর হ্যাজাকের সেই উজ্জ্বল আলোয় কচিকাচারা চলে যেত এক আনন্দের জগতে। গ্রামবাংলা থেকে ক্রমেই যেন হারিয়ে যেতে বসেছে প্রাচীনতম আলোর সরঞ্জাম হ্যাজাক লাইট। বিয়ে-শাদি, পূজা -পার্বণ, যাত্রাপালা, এমন কি ধর্ম সভায়ও ভাড়া দেওয়া হত এই হ্যাজাক লাইট। কেমন ছিল হ্যাজাক? দেখতে অনেকটা হ্যারিকেনের মতোই কিন্তু আকারে বেশ বড়। আর প্রযুক্তিও ভিন্ন রকম, জ্বলে পাম্প করে চালানো সাদা কেরোসিনের কুকারের মতো একই প্রযুক্তিতে। চুলার বার্নারের বদলে এতে আছে ঝুলন্ত একটা সলতে। যেটা দেখতে প্রায় ১০০ ওয়াটের সাদা টাংস্টেন বাল্বের মতো। এটি অ্যাজবেস্টরে তৈরি। এটা পুরে ছাঁই হয়ে যায় না। পাম্প করা তেল একটা নলের ভিতর দিয়ে গিয়ে স্প্রে করে ভিজিয়ে দেয় সলতেটা। এটা জ্বলতে থাকে চেম্বারে যতক্ষণ তেল আর হাওয়ার চাপ থাকে ততক্ষণ। তেলের চেম্বারের চারিদিকে থাকে চারটি বোতাম। একটি পাম্পার। একটি অ্যাকশন রড়। একটি হাওয়ার চাবি। আর একটি অটো লাইটার বা ম্যাচ। অ্যাকশন রডের কাজ হচ্ছে তেল বের হওয়ার মুখটা পরিষ্কার রাখা । হাওয়ার চাবি দিয়ে পাম্পারে পাম্প করা বাতাসের চাপ কমানো বা বাড়ানো হয়। একবার হাওয়া দিলে জ্বলতে থাকে কয়েক ঘন্টা আর দের থেকে দুই লিটার তেলে জ্বলত সারা রাত। বর্ষার শুরতে এবং শীতের শুরুতেই যখন নদী-নালায় পানি কমতে থাকে তখন রাতের বেলায় হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে অনেকে মাছ শিকার করে। তবে এটা চলে বছরে মাত্র মাস দুয়েক। এই বাতির ব্যবহার অতি প্রাচীন। সাধারণত বাতি বলতে বুঝায় কুপি, টর্চ লাইট, হ্যারিকেন ও হ্যাজাক। বাতি হল সেই সরঞ্জাম যা অন্ধাকার দূর করতে ব্যবহার করা হয়। প্রাচীনকালে আগুনের ব্যবহারের মাধ্যমে বাতির প্রচলন হয়। প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে সবখানেই। ফিলামেন্ট বাতির বদলে এলইডি বাতির চলও নতুন নয়। তবে এলইডির সঙ্গেও এখন যুক্ত হয়েছে নানা রকম প্রযুক্তির বাতিও হয়েছে স্মার্ট। বাজার ঘুরে জানানো হচ্ছে বাসা-বাড়ি, অফিস, কারখানার নানারকম বাতির খোঁজ। হ্যাজাক লাইট মেরামতকারি রমেশ চন্দ্র দাস এর সাথে কথা হলে তিনি জানান, ২০ বছর আগে হ্যাজাকের ব্যবহার যতেষ্টো ছিল। তখন হ্যাজাক লাইট ঠিক করে আয় ভাল হত। দিনে ৪-৫টি করে মেরামত করে ২০০-৩০০ টাকা পর্যন্ত রোজগার করতাম। কিন্তু বর্তমানে হ্যাজাক লাইট নেই বললেই চলে। তাই এখন পেশা পরিবর্তন করে বাইসাইকেল(দিচক্রযান) এর মেরামতের কাজ করি। হ্যাজাক লাইটের ‘বানা’র কাজ হচ্ছে তেল সাপলাই দেওয়া, পিন: তেল বন্ধ করা এবং খোলা, মাটিরছিদ্র, ভেপার: তেল সাপলাই দিয়ে ম্যান্ডলে দেয়, ম্যাকজিনে ম্যান্ডল বাধা হয়, ম্যাকজিন তেল সাপলাই দেয়, চিমনি/কাচের কাজ হচ্ছে আলো বৃদ্ধি করা এবং এর নিচের অংশে সংযুক্ত স্টিলের তৈরি বিশেষ পাত্রে তেল ধরে দের থেকে দুই কেজি। এই তেল দিয়ে প্রায় সারা রাত চলে যেতো । সবার ঘরে না থাকায় অনেক সময়, প্রায় ৪০ বছর আগে এসব লাইট এক রাতের জন্য ১২৫-১৫০ টাকা করে ভাড়াও দেওয়া হত জৈষ্ঠ থেকে ফাল্গুন মাস পর্য়ন্ত মাছ শিকারের জন্য বলেও জানান- বর্তমানে হ্যাজাক ব্যবহার কারী , মজিবর রহমান( ৬০) ও আয়নাল হক( ৪৫)। আরেকটি ছিল হারিকেন, তুলনামূলকভাবে এটি একটি ঘরে আলো দানকারী ক্ষমতার বস্তু হিসেবে প্রত্যেকটা ঘরে ঘরে ছিল এর ব্যবহার, ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ালেখা, ঘর আলোকিত করা, কিংবা অন্ধকারে সেকালে আলোর উৎস মানেই প্রত্যেকটা ঘরেই ছিল এই হারিকেন নামক বস্তুটি, কিন্তু তাও আজ কালের বিবর্তনে বিলুপ্তির পথে। এটাও কেরোসিন দিয়েই জালানো হত, আগুন জ্বালানোর জন্য বিশেষ মেকানিজমে তৈরি আধা ইঞ্চি থেকে ১ ইঞ্চি সাইজের ফিতা দিয়ে নিচের তেল রাখার পাত্র থেকে টেনে উপরে আলো জ্বালানোর এক পদ্ধতি। বৈদ্যুতিক পাখার রেগুলেটর এর মত এর আলো বাড়ানো কমানোর জন্য এনালগ পদ্ধতির একটি চাকাও ছিল যা দিয়ে আলো বাড়ানো যেত এবং কমিয়ে রেখে মানুষ ঘুমিয়ে পড়তো। হ্যাজাক ও এই হাড়িকেন উভয়টির ক্ষেত্রে চারিদিকে বাতাস অপরিবাহী কাচের তৈরি বিশেষ চিমনি ছিল । এই হারিকেন ও আজকাল তেমন একটা দেখা যায় না বললেই চলে। কুপি ছিল সর্বশেষ গ্রামীণ পরিবেশের রান্নাঘরের একটা ঐতিহ্যবাহী আলো দানকারী বস্তু, এই কুপি এবং হ্যারিকেন এর মধ্যে পার্থক্য ছিল তৎকালীন গ্রামের ধনী ও দরিদ্রদের মধ্যে পার্থক্যকারী একটি আলোর উৎস। গ্রামীণ পরিবেশে তুলনামূলক সম্পদশালীদের ঘরে হারিকেন দেখা গেলেও কুপির দেখা মিলত দরিদ্র পরিবার গুলোতে। তবে রান্নাঘর গুলোতে গ্রামের বিত্তশালীরাও সুবিধার জন্য এই কুপির ব্যবহার করত। এটি শুধুমাত্র মাথায় সলতে দিয়ে নিচের পাত্র থেকে তেল টেনে জ্বালানোর একটা সহজ পদ্ধতির যন্ত্রবিশেষ। যুগের আবর্তে আজ এর সবগুলোই বিলুপ্ত প্রায়। শহুরে পরিবেশ গ্রামীন পরিবেশের মধ্যে বৈদ্যুতিক আলোর কারণে এখন আর তেমনটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না। গ্রামে বিদ্যুৎ চলে আসার পর থেকে হ্যাজাকের কদর তেমনটা নেই, হারিকেন ও আর লাগেনা, আর কুপির ব্যবহারও নেই বললেই চলে। এভাবে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে একসময়ের জনপ্রিয় প্রাচীনতম আলোর উৎস হ্যাজাক, হারিকেন ও কুপি । শায়েস্তা খানের আমলে ১ টাকায় ১ মণ ধান পাওয়া গেলে বা একটা গরু মিললেও এখন যেমন তার পুরোটাই ঐতিহাসিক ঘটনা মনে হয়, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ঠিক তেমনই মনে হবে এই হ্যাজাক, হারিকেন ও কুপির গল্পগুলোও। নতুন প্রজন্মের কাছে আজ সেগুলো সবই শায়েস্তা খাঁর আমলের মতই যেন ইতিহাস।






«
Next
Newer Post
»
Previous
Older Post

No comments:

Leave a Reply