স্কয়ারের বিশাল সাম্রাজ্যর নির্মাতা বা স্থপতি কালপুরুষ : স্যামসন এইচ চৌধুরী আলোকিত এক জীবন
গোপালগঞ্জের নিভৃত গ্রাম আড়ুয়াকান্দিতে ১৯২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জন্ম নিয়েছিলেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। তখন কে জানত, এ গ্রামের ছেলে একদিন হয়ে উঠবে বাংলাদেশের শিল্প-বাণিজ্যের আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র। গোপালগঞ্জের নিভৃত গ্রাম আড়ুয়াকান্দিতে ১৯২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জন্ম নিয়েছিলেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। তখন কে জানত, এ গ্রামের ছেলে একদিন হয়ে উঠবে বাংলাদেশের শিল্প-বাণিজ্যের আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র। পিতা ইয়াকুব হোসেন চৌধুরী ছিলেন চিকিৎসক; চাকরির সূত্রে ঘুরেছেন নানা জায়গায়। সেই ভ্রমণশীল জীবনের সঙ্গে ছোট স্যামসনও শিখে নিয়েছিলেন মানিয়ে নেয়া, তৈরি হয়েছিল নতুনের প্রতি অদম্য কৌতূহল। চাঁদপুরের মিশন স্কুলে শুরু, তারপর পাবনার আতাইকুলা, ময়মনসিংহের ভিক্টোরিয়া মিশন স্কুল, আর পরে পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুরের শিক্ষা সংঘ হাইস্কুল—শৈশবের প্রতিটি অধ্যায় যেন তাকে প্রস্তুত করেছে এক অজানা অভিযাত্রার জন্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অস্থির সময়ে যখন পরিবার তাকে ফিরিয়ে আনল গ্রামে, তখনো তার ভেতরে জেগে উঠছিল—অচেনা দিগন্তে পৌঁছার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। মাত্র সতেরো বছর বয়সেই সেই আকাঙ্ক্ষা তাকে নিয়ে গেল কলকাতায়। পরিবারকে অবহিত না করে বন্ধুদের সঙ্গে কলকাতায় যান। সেখান থেকে মুম্বাই। ভাগ্য অন্বেষণে বেরোনো কিশোর হঠাৎ করে পেয়ে গেল জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা—নৌবাহিনীতে চাকরির সুযোগ। সিগন্যালিং বিভাগে নাম লেখালেও স্বপ্ন ছিল রাডারের রহস্য জানা। যুদ্ধকালে রাডার তখন নতুন উদ্ভাবন। স্যামসন চাইতেন সরাসরি এ প্রযুক্তি শিখতে। নির্দেশ অমান্য করায় তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। চারদিনের অন্ধকার সেলে থেকেও ইচ্ছা বিসর্জন দেননি। পঞ্চম দিনে অবশেষে দরজা খুলল তার জন্য—নিযুক্ত হলেন রাডার অপারেটর হিসেবে। এ ছিল কেবল একটি পদ নয়, বরং ছিল ভবিষ্যতের স্যামসনের চরিত্রের প্রতীক—অটলতা, সাহস আর নতুনকে জানার তৃষ্ণা। স্যামসন রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভিতে প্রায় তিন বছর কাজ করেন। যুদ্ধ শেষ হলে সহকর্মীদের সঙ্গে মাদ্রাজে বিশাখাপত্তনম বন্দরে ফেরেন। কিন্তু ইতিহাসের ডাক আবারো তাকে টেনে নিল। ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে নৌ-বিদ্রোহে তিনি সরাসরি অংশ নেন। ধরা পড়ে গেলেন জেলে, কনসেনট্রেশন ক্যাম্পেও। তবে বিদ্রোহীদের প্রতি ক্ষমাশীল মনোভাব দেখানো হয়। তাদের দেয়া হয় দুটি বিকল্প। এক নৌবাহিনীতে অব্যাহত থাকা, দুই চাকরি ত্যাগ করা। স্যামসন পছন্দ করেন চাকরি ত্যাগের পথ। বাড়ি ফেরার পর ১৯৪৭ সালে স্যামসন এইচ চৌধুরী পাবনার ডাক বিভাগে যোগ দেন। একই বছর বিয়ে করলেন অনিতা বিশ্বাসকে। ডাক বিভাগে কর্মরত অবস্থায় ট্রেড ইউনিয়নের আন্দোলনে যুক্ত হন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন। এমনকি এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। ফলাফল—বদলি এবং অবশেষে চাকরি ছেড়ে ঘরে ফেরা। তখনই পিতার পরামর্শে দায়িত্ব নিলেন পারিবারিক ওষুধের দোকান ‘হোসেন ফার্মেসি’র। ব্যবসা ভালোই চলছিল, কিন্তু তার স্বপ্ন এর চেয়ে বড়। ১৯৫৬ সালে বাবার কাছ থেকে ধার নিলেন মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। শুরু করলেন নতুন কোম্পানি—‘ইসন্স’ অর্থাৎ ইয়াকুব হোসেন অ্যান্ড সন্স। শুরু হয় সিরাপ উৎপাদন দিয়ে। সেখানে মালিক তিনি, কর্মী এবং বিপণন কর্মকর্তাও তিনি নিজেই। পাশে ছিলেন কেবল স্ত্রী অনিতা। ছোট্ট এ প্রচেষ্টাও তাকে থামাতে পারল না। ১৯৫৮ সালে তিন বন্ধু—ডা. কাজী হারুনুর রশিদ, ডা. পি কে সাহা আর রাধা বিনোদ রায়কে সঙ্গে নিয়ে জন্ম দিলেন এক নতুন স্বপ্নের নাম— ‘স্কয়ার’। ছোট্ট টিনশেড ঘরে মাত্র ১৭ হাজার টাকা নিয়ে যাত্রা শুরু। প্রথম কারখানার জন্য স্যামসন পাবনা শহরে একটি ছোট টিনশেড ঘর ভাড়া নিয়ে সেটিকে কারখানায় রূপান্তর করেন। শুরুতে ১২ জন শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। প্রথম উৎপাদিত ওষুধ ছিল ‘ইস্টন সিরাপ’, যা রক্ত পরিশোধক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। প্রথম তিন বছর লাভ নেই। কিন্তু তাদের জেদ টলল না। চতুর্থ বছরে প্রথম লাভ, আর সেখান থেকেই শুরু হলো এক অনবদ্য অভিযাত্রা। ১৯৬২ সালে ঢাকার হাটখোলায় একটি শাখা অফিস খোলা হয়। ১৯৬৪ সালে এটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়। অনুমোদিত মূলধন ৫ লাখ টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৪ লাখ টাকা। ১৯৭৪ সালে এল বড় বাঁক। বেলজিয়ামের জানসেন ফার্মাসিউটিকার লাইসেন্স পেল স্কয়ার। এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জনসন অ্যান্ড জনসনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। শুরু হলো আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন। ডায়রিয়ার ওষুধ ভিরমক্স, ইমোডিয়াম—বাংলাদেশের বাজারে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। ১৯৮২ সালের ড্রাগ পলিসি যেন আশীর্বাদ হয়ে এল। বহুজাতিকের আধিপত্য কমে গেলে স্কয়ার দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে গেল জাতীয় শীর্ষে। ১৯৮৫ সালে তারা হয়ে গেল দেশের সেরা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি। দুই বছর পর ইতিহাস রচনা করল স্কয়ার—প্রথম বাংলাদেশী কোম্পানি হিসেবে বিদেশে ওষুধ রফতানি। তবে স্যামসনের দৃষ্টি শুধু ওষুধে আটকে থাকেনি। তিনি বুঝেছিলেন, দেশের উন্নয়ন বহুমুখী শিল্প ছাড়া সম্ভব নয়। তাই একে একে গড়ে তুললেন স্কয়ার টয়লেট্রিজ, টেক্সটাইলস, স্পিনিং, নিট ফ্যাব্রিকস, ফ্যাশনস, কনজিউমার প্রডাক্টস, ইনফরমেটিক্স, এমনকি হাসপাতালও। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই ছিল তার স্বপ্ন, ছিল নৈতিকতার ছাপ।অবসরে সহধর্মিনী অনিতা চৌধুরীর সঙ্গে পুরস্কার ও সম্মাননা এল একের পর এক—‘বিজনেস এক্সিকিউটিভ অব দ্য ইয়ার’, ‘বিজনেস পারসন অব দ্য ইয়ার’, ‘বেস্ট এন্টারপ্রাইজ’ ইত্যাদি। পেয়েছেন একুশে পদক (মরণোত্তর)। তিনি মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ছিলেন মাইক্রো ইন্ডাস্ট্রিজ ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যান্ড সার্ভিসেসের চেয়ারম্যান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশের সহসভাপতি, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) পরিচালক। ২০০৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর, প্রথম জাতীয় আয়কর দিবসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তাকে দেশের সর্বোচ্চ করদাতার মর্যাদা দেয়। ২০০৯-২০১০ সালে তাকে দেয়া হয় সিআইপি (কমার্শিয়ালি ইম্পর্ট্যান্ট পারসন) মর্যাদা, যা দেশের ব্যবসায়িক সমাজে তার অবদানকে স্বীকৃতি দেয়। পুরস্কার ও স্বীকৃতি তার কাছে ছিল কেবল প্রতীক। আসল গৌরব ছিল সততার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা, দেশের শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে দেয়া। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। ২৫ মার্চের ভয়াল রাতে পাকিস্তানি সেনাদের হত্যাযজ্ঞের পর তিনি পরিবারকে নিয়ে নদীপথে পাবনার গ্রামের বাড়িতে যান। তিনি গোপনে মুক্তিবাহিনীর জন্য ওষুধ, খাদ্য ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতেন, আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা দিতেন। তার তৃতীয় ছেলে অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু মাত্র ১৭ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আন্তর্জাতিক চার্চ ফোরামে তিনি পাকিস্তানি সেনাদের নির্যাতনের তথ্য পৌঁছে দিয়েছিলেন বিশ্ববাসীর কাছে। আর যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে সিসিডিবি গঠনে তার উদ্যোগ ছিল দেশের পুনর্গঠনের জন্য এক অনন্য পদক্ষেপ। ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি সিঙ্গাপুরের রÅvফলস হাসপাতালে যখন তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন, তখন তার বয়স ৮৬। মৃত্যুর পর রাজধানীর কাকরাইল চার্চে তার জানাজায় কেঁদেছিল পুরো জাতি। প্রধানমন্ত্রী থেকে বিরোধীদলীয় নেত্রী, ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ মানুষ—সবার চোখে ছিল শোক, সবার কণ্ঠে ছিল কৃতজ্ঞতা। পরদিন পাবনার আস্থ্রা ফার্মহাউজে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় তাকে। পাবনার মাটিতে যখন তাকে শায়িত করা হলো তখন বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল দীর্ঘ যাত্রাপথের প্রতিধ্বনি—চাঁদপুরের মিশন স্কুল থেকে শুরু, নৌবাহিনীর রাডার ইউনিটের সাহসী সিদ্ধান্ত, হোসেন ফার্মেসির ছোট্ট টেবিল, আর সেখান থেকে স্কয়ারের বিশাল সাম্রাজ্য। তার জীবন যেন প্রমাণ করে দেয়—মাটির কাছ থেকে উঠে আসা মানুষও হতে পারে মহীরুহ। আর তার বিদায় স্মরণ করিয়ে দেয়, আলো নিভে গেলেও দ্যুতি থেকে যায় দীর্ঘদিন। বেঁচে থাকলে আজ শতবর্ষী হতেন তিনি। তবে তার উপস্থিতি আজও স্পষ্ট হয়ে আছে গড়ে তোলা প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, কর্ম আর নিষ্ঠায়। এক শতাব্দী আগে জন্মানো সেই শিশুর হাত ধরে বাংলাদেশ পেয়েছিল এক আলোকবর্তিকা; তার প্রস্থান ঘটেছে বহু আগে, কিন্তু যে আলোক শিখা জ্বালিয়ে গেছেন তা এখনো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে যাচ্ছেগ্রন্থনা:অধ্যক্ষ মহসীন আলী আঙ্গুঁর ,সম্পাদক ও প্রকাশক, মুজিবনগর খবর ডট কম,মেহেরপুর।Slider
দেশ
মেহেরপুর জেলা খবর
মেহেরপুর সদর উপজেলা
গাংনী উপজেলা
মুজিবনগর উপজেলা
ফিচার
খেলা
যাবতীয়
ছবি
ফেসবুকে মুজিবনগর খবর
Home
»
English News
»
lid news
»
others
»
world
» স্কয়ারের বিশাল সাম্রাজ্যর নির্মাতা বা স্থপতি কালপুরুষ : স্যামসন এইচ চৌধুরী আলোকিত এক জীবন
Mujibnagar Khabor's Admin
We are.., This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
Labels
- Advertisemen
- Advertisement
- Advertisementvideos
- Arts
- Education
- English News
- English News Featured
- English News lid news
- English News national
- English News news
- English Newsn
- Entertainment
- Featured
- games
- id news
- l
- l national
- li
- lid news
- lid news English News
- lid news others
- media
- national
- others
- pedia
- photos
- politics
- politics English News
- t
- videos
- w
- world
- Zilla News
জনপ্রিয় পোস্ট
-
দেশের প্রখ্যাত ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ আহ্ছানিয়া মিশন ক্যান্সার ও জেনারেল হাসপাতালের ১৫০ জন চিকিৎসক জনস্বাস্থ্য রক্ষার্থে তামাক নিয়ন...

No comments: