Sponsor



Slider

দেশ

মেহেরপুর জেলা খবর

মেহেরপুর সদর উপজেলা


গাংনী উপজেলা

মুজিবনগর উপজেলা

ফিচার

খেলা

যাবতীয়

ছবি

ফেসবুকে মুজিবনগর খবর

» » » » ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভারতের সুমুদ্র যাত্রাপথে জাপানের ভয়াবহ এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়ে ২৮০জন যাত্রীর সলিল সমাধি ঘটেছিল।




তখন চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডব। ২৩শে নভেম্বর ১৯৪২। এস এস তিলাওয়া যাত্রী ও ক্রু নিয়ে রওনা দেয় ভারতের মুম্বাই থেকে পূর্ব আফ্রিকার পথে এবং যাত্রাপথে ভয়াবহ এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়ে তার সলিল সমাধি ঘটে। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনা থেকে যারা প্রাণে বেঁচে যান তাদের মধ্যে বর্তমানে জীবিত আছেন মাত্র দুজন। তাদের একজন অরবিন্দ জানির বয়স এখন ৮৩ ছাড়িয়ে গেলেও সেই রাতের কথা তার স্পষ্ট মনে আছে। “সেটা ছিল পুর্ণিমার রাত। হঠাৎ দেখলাম জাহাজটা ডুবে যাচ্ছে। অনেকের মৃতদেহ সাগরে ভাসছে। জাহাজ থেকে তারা পড়ে গেছে সাগরের জলে। জ্যোৎস্নার আলোয় মৃতদেহগুলো দেখা যাচ্ছে- তাদের চারপাশ ঘিরে ভাসছে পোশাক আশাক আর অন্যান্য জিনিসপত্র,” বর্তমানে ব্রিটেনের বাসিন্দা অরবিন্দ জানি বলেছেন বিবিসির বেন হেন্ডারসনকে। আটলান্টিক মহাসাগরে ডুবে যাওয়া টাইটানিক জাহাজের কথা সারা পৃথিবীর বহু মানুষই জানে, কিন্তু যাত্রীবাহী ভারতীয় জাহাজ এসএস তিলাওয়া, যা পরিচিতি পেয়েছিল 'ভারতীয় টাইটানিক' নামে তার ডুবে যাওয়ার মর্মান্তিক কাহিনি ইতিহাসের পাতা থেকে একরকম হারিয়েই গেছে। সাড়ে নয়শ’র ওপর যাত্রী ও ক্রু নিয়ে ভারত মহাসাগরে ডুবে যাওয়া সমুদ্রগামী এই স্টিম শিপটি জাহাজ দুর্ঘটনায় একই ধরনের ভয়াবহতার কারণে পরিচিতি পেয়েছিল ‘ভারতীয় টাইটানিক’ নামে।আচমকা বিস্ফোরণ ওই জাহাজডুবি কেড়ে নিয়েছিল বহু মানুষের প্রাণ। বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল শত শত পরিবার। অরবিন্দের বাবা থাকতেন কর্মসূত্রে আফ্রিকায়। তার বয়স তখন সাড়ে তিন। তিনি থাকতেন মায়ের সাথে ভারতের গুজরাটে তাদের গ্রামে। জাহাজের অন্য যে যাত্রী আজও জীবিত তিনি হলেন বর্তমানে আমেরিকার বাসিন্দা তেজ প্রকাশ মাঙ্গাত। “প্রতি চার বছর অন্তর অন্তর আমরা সেখানে বেড়াতে যেতাম। আমি, আমার ভাইয়েরা আর আমার বাবামা। ওই ঘটনার সময় আমার সবচেয়ে ছোট ভাইয়ের বয়স ছিল ৭, অন্য দু ভাই ১২ আর ১৪। আমার বয়স ছিল নয়,” বলছিলেন তিনি। এস এস তিলাওয়া ২৩শে নভেম্বরের রাতে ভারত মহাসাগরের নিস্তরঙ্গ শান্ত জলরাশির মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল তার গন্তব্যে। শান্ত সিগ্ধ রাতের আকাশ ছিল পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায় ভরা। পূর্ণ চাঁদের আলোয় সমুদ্রের জল চিকচিক করছিল। কাছেই ছিল সেশেলস দ্বীপের উপকূল। দুর্ঘটনাস্থল থেকে প্রায় হাজারখানেক মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে। শিশু অরবিন্দ ছিলেন মায়ের সাথে নিচের ডেকে। “রাতের বেলা মা হঠাৎ শুনলেন বোমা ফাটার মত একটা বিকট আওয়াজ। বিস্ফোরণে জাহাজটা বিচ্ছিরিরকম ফেটে গিয়ে ধীরে ধীরে ডুবতে শুরু করল।” প্রাণ বাঁচানোর জন্য হুড়োহুড়ি জাপানি সাবমেরিন থেকে ছোড়া একটা টর্পিডো জাহাজটিতে আঘাত করেছিল। বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডব যখন চলছে, তখন জাপানি ডুবোজাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হচ্ছিল বিভিন্ন সমুদ্রপথে। কিন্তু এস এস তিলাওয়া কোন রণতরী ছিল না, ছিল যাত্রীবাহী জাহাজ। অরবিন্দের মা তখন পাগলের মত জীবন রক্ষাকারী লাইফ বোট খুঁজছেন। অরবিন্দর এখনও সেই দৃশ্য মনে আছে। “মা কোন জিনিসপত্র নেননি। শুধু একটা শাল দিয়ে আমাকে শক্ত করে বেঁধে নিয়েছেন নিজের পিঠে। যাতে তার হাত দুটো খোলা থাকে। এরপর দড়ি বেয়ে আমাকে নিয়ে নিচে নেমে লাইফ বোটে ওঠেন তিনি। নৌকায় ওরা সবাইকে বিস্কুট আর পানি দিচ্ছিল।” তিনি পরে জেনেছিলেন ওরা এক একটা নৌকায় ১৫ থেকে বিশ জনকে উঠতে দিচ্ছিল। ওদিকে, সেসময় কিশোরী তেজ তখনও জাহাজের ভিতর। “আমি শুনলাম বাবা আমার নাম ধরে ডাকছেন। আমি দেখলাম আমার চারপাশে জল উঠছে, আমি ডুবে যাচ্ছি। বাবা বললেন আমার হাত ধরো। তিনি আমাকে টেনে তুললেন- আমাকে লাইফ বোটে তুলে দিয়ে তিনি ফিরে গেলেন জাহাজে- বললেন ভাইদের খুঁজতে যাচ্ছেন। বললেন - শিগগিরি ফিরে আসবেন।” পরিত্রাহি চিৎকার আর কালো ধোঁয়া বাবা তাকে লাইফ বোটে তুলে দেওয়ার পর নৌকার রশি খুলে নৌকা ছেড়ে দেওয়া হল, বিবিসিকে বলেন তেজ প্রকাশ মাঙ্গাত। “দেখলাম মানুষজন পরিত্রাহি চিৎকার করছে, কাঁদছে। আমি মুখ তুলে জাহাজের দিকে তাকালাম দেখতে বাবা ফিরেছেন কিনা। সেদিন পূর্ণিমা ছিল। হঠাৎ শুনলাম বিশাল একটা বিস্ফোরণের আওয়াজ।” সেটা ছিল দ্বিতীয় টর্পিডোর আঘাত। “দেখলাম কালো ধোঁয়া উঠছে। এরপর জাহাজটা ডুবে গেল।” তেজ বলছিলেন তিনি তখন লাইফ বোটে- জাহাজ থেকে কিছুটা দূরে- কিন্তু তার বাবা আর ভাইরা তখনও জাহাজে। লাইফ বোট ছাড়ার আগে তিনি দেখেছিলেন বাবাকে একা। তার ধারণা ভাইদের তিনি আর ভেতরে খুঁজে পাননি, তাই একাই ফিরে এসেছিলেন। “তিনি জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছিলেন। হয়ত ভাবছিলেন ঝাঁপ দেবেন, কিন্তু দেননি। কিন্তু দ্বিতীয় টর্পিডো আঘাত হানার পর তিনি ভেঙে পড়া জাহাজের সাথে তলিয়ে গেলেন। নিশ্চয়ই তিনি ডুবতে ডুবতে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছিলেন- আমাকে বাঁচাও!” তেজ পরে বাবার মুখে শুনেছিলেন, কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করেই তিনি ভেসে ওঠেন। সাঁতরাতে শুরু করেন আর একটা ভেলার মত কিছু পেয়ে তা আঁকড়ে ধরে ভাসতে থাকেন। “এভাবে তিনি নিজের প্রাণ বাঁচান।” সেসময় তেজ ভাসছিলেন একটা লাইফ বোটে। বিশাল ভারত মহাসাগরের বুকে ছোট একটা সমুদ্র এলাকায় তাদের লাইফ বোট ভেসে বেড়িয়েছিল পুরো একটা দিন। অবশেষে ব্রিটিশ একটি রণতরী উদ্ধার করে অরবিন্দ আর তেজকে। তিলাওয়া ১৯৪২ নামে একটি আন্দোলন গোষ্ঠীর তথ্য অনুযায়ী ৬৭৮জন প্রাণে বেঁচে যান, মারা যান ২৮০জন। উদ্ধার পর্ব তেজ-এর পরিবারের বাকিদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল? “পরের দিন আমরা উদ্ধারকারী জাহাজের উপরের ডেকে অপেক্ষা করছিলাম দেখার জন্য কারা বেঁচে আছেন! কারা ফিরে আসেন! কিন্তু প্রথম দিন বাবা এলেন না চিরতরে স্বজন বিচ্ছেদ তেজের বাবা ফিরে এলেন দ্বিতীয় দিন। “আমি এত খুশি হয়েছিলাম! কিন্তু তিনি এসেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তিনি আমাকে প্রাণে বাঁচিয়েছেন, কিন্তু তখন যে তিনি আমার আশেপাশে আমার মাকেও খুঁজছিলেন, সেই স্মৃতি ছিল তার জন্য মর্মান্তিক।” এর পরের কয়েক সপ্তাহ, কয়েক মাস, তেজের বাবা পরিবারের বাকি সদস্যদের খুঁজে বেড়িয়েছেন। “বাবা রেড ক্রসের কাছে চিঠি লিখতে শুরু করেন। একবার রেডিওতে আমার মায়ের নাম শুনে তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন। আমাকে বলেন – তোমার মা বেঁচে আছেন। কিন্তু পরের দিন জানা যায় তিনি অন্য এক মহিলা – মালয়েশিয়া না কোথায় জানি থাকেন। বাবা এরপর আবার কাঁদতে শুরু করেন।” তেজ তার মা ও ভাইদের আর কখনও দেখেননি। উদ্ধার করা যাত্রীদের মুম্বাই পৌঁছে দেওয়া হয়। মৃত ভেবে শোকপালন অরবিন্দ আর তার মা সেখানে থেকে ফিরে যান ভারতের গুজরাটে উপকূলীয় শহর জোডিয়ার কাছে তাদের গ্রামে। “মা একটা চিঠি লিখেছিলেন গ্রামে জানাতে যে আমরা বেঁচে আছি, ভাল আছি। কিন্তু কী কারণে সেই চিঠি গ্রামে পৌঁছয়নি। আমরা যখন জোডিয়া পৌঁছলাম, জানতে পারলাম জাহাজ দুর্ঘটনায় মৃতদের মধ্যে আমরাও আছি ধরে নিয়ে তারা ১৩দিনের শোক পালন করেছে।” অরবিন্দ আর তার মা যেদিন নিজেদের গ্রামে পৌঁছলেন সেদিন তাদের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান হচ্ছে। তবে প্রতিবেশিরা যখন খবর পেলেন তারা বেঁচে আছেন তারা জামাকাপড় আর খাবার নিয়ে ছুটে এলেন তাদের দেখতে। “আমরা যখন গ্রামে পৌঁছলাম সবাই যে কী খুশি হয়েছিল আমাদের দেখে!” ওদিকে পূর্ব আফ্রিকার মোম্বাসায় অরবিন্দের বাবা তখন চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি জানতেন না তার স্ত্রী ও ছেলে বেঁচে আছে কিনা। “বাবা আমাদের খবর পান দুর্ঘটনার দু সপ্তাহ পরে। তিনি জানতেন জাহাজের সাথে আমাদের সলিল সমাধি হয়েছে। তিনিও শোক পালন করেছিলেন,” বলছেন অরবিন্দ জানি। তিনি বলেন তাদের দেখা হওয়া ছিল প্রচণ্ড আবেগের। “আমাদের দেখে তিনি খুশিতে ফেটে পড়েছিলেন!” উত্তরের অপেক্ষায় এত বড় একটা দুর্ঘটনা স্বত্ত্বেও তিলাওয়া জাহাজডুবির ঘটনা ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়েই গেছে। কেন জাপানি সাবমেরিন সাধারণ যাত্রীবাহী জাহাজের ওপর টর্পিডো হামলা চালিয়েছিল সে উত্তর এখনও পাননি নিহতদের স্বজনরা। জাহাজডুবিতে যারা মারা গিয়েছিলেন তাদের স্বজনরা মর্মান্তিক সেই দুর্ঘটনার ৮০ বছর পর, ২০২২ সালে মুম্বাইতে একটি স্মরণসভার আয়োজন করেন। এই ঘটনা সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। অরবিন্দ জানির সন্তান ও নাতিনাতনিরা মুম্বাইতে যোগ দেন ‘ভারতীয় টাইটানিক’ নামে পরিচিত সেই জাহাজডুবির স্মরণে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে। ওই দুর্ঘটনায় বাবাকে হারানো ১৪ বছরের এক কিশোর একটি কবিতা লিখেছিল। মুম্বাইতে ২০২২এর ওই স্মরণ অনুষ্ঠানে পশ্চিম ভারতে ব্রিটিশ উপ রাষ্ট্রদূত অ্যালান গেমেল পাঠ করেছিলেন সেই কবিতা। কবিতায় কিশোরটি লিখেছিল: “আমার বাবা ও সৎমা, আমার তিন ভাইবোনকে নিয়ে ওই জাহাজে আফ্রিকা পাড়ি দিয়েছিলেন। হাসিমুখে বাবা বলে গিয়েছিলেন - শিগগিরি ফিরে আসছি – তখন কী জানতাম মৃত্যু তাদের দুয়ারে! আবার আমরা মিলব পরপারে- যেখানে কেউ কখনও আমাদের বিচ্ছেদ ঘটাতে পারবে না।” নিহতদের স্বজনদের আজও প্রত্যাশা জাপানিরা ওই হামলার জন্য তাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।।"গ্রন্থনা:অধ্যক্ষ মহসীন আলী আঙ্গুঁর ,সম্পাদক ও প্রকাশক, মুজিবনগর খবর ডট কম,মেহেরপুর।






«
Next
Newer Post
»
Previous
Older Post

No comments:

Leave a Reply