বেঙ্গলে ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের জন্য কতোটা দায়ী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল? আমার শৈশবে উইনস্টন চার্চিল সম্পর্কে আমি প্রথম জানতে পারি। আমি শিশু সাহিত্যিক এনিড ব্লাইটনের একটি বই পড়ছিলাম। তিনি লিখেছেন ওই "মহান রাষ্ট্রনায়কের প্রতি তার এতোটাই শ্রদ্ধা ছিল" যে তার একটি ছবি তিনি তার বাড়ির ফায়ার প্লেসের ওপরে সাজিয়ে রেখেছিলেন। বড় হওয়ার সাথে সাথে আমি যতোই ভারতের ঔপনিবেশিক অতীতের বিষয়ে লোকজনের সঙ্গে আলোচনা করি, ততোই দেখতে পাই যে আমার দেশের বেশিরভাগ মানুষ যুদ্ধকালীন এই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেন। ঔপনিবেশিক শাসনের ব্যাপারেও রয়েছে একেক জনের একেক র
কমের মতামত। অনেকের কথা হলো ব্রিটিশরা ভারতের জন্য অনেক কিছু করেছে- তারা রেলওয়ের অবকাঠামো নির্মাণ করেছে, তৈরি করেছে ডাক বিভাগ। "তারা তাদের নিজেদের জন্যই এসব করেছে এবং তার ফলে ভারত একটি দরিদ্র ও লুট হয়ে যাওয়া দেশে পরিণত হয়েছে," কেউ কেউ তার জবাব দিয়েছে এভাবেআমার দাদি সবসময় আবেগের সঙ্গে বলতেন যে কীভাবে তারা "ওইসব বর্বর ব্রিটিশের" বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছেন। আমি যে ভারতে বড় হয়েছি, এধরনের ক্ষোভ সত্ত্বেও সেদেশে যা কিছু পশ্চিমা অথবা সাদা চামড়ার কেউ কিছু করলে বা বললে সেটাকে অনেক বড় করে দেখা হতো। কয়েক দশকের ঔপনিবেশিক শাসনের কারণে এদেশের মানুষের আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে মুছে গিয়েছিল। স্বাধীনতার পর গত ৭৩ বছরে ভারতে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তৈরি হয়েছে নতুন এক ভারতীয় প্রজন্ম যারা বিশ্বে নিজেদের দেশের অবস্থানের ব্যাপারে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। তারা এখন প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে যে আমাদের ঔপনিবেশিক শাসনামলের বহু কালো অধ্যায়ের ব্যাপারে এখনও কেন পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব রয়েছে এবং আমরা কেন সেগুলোর নিন্দা করি না। এরকম কালো অধ্যায়ের একটি হচ্ছে ১৯৪৩ সালে বেঙ্গলের বা বাংলার দুর্ভিক্ষ। সেসময় অনাহারে মারা গেছে কমপক্ষে ৩০ লাখ মানুষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের যতো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এই সংখ্যা তার চেয়েও ছয় গুণ বেশি। প্রতি বছরেই ব্রিটিশদের যুদ্ধ জয় এবং তাতে নিহতদের স্মরণ করা হয়, কিন্তু এই একই সময়ে ব্রিটিশ-শাসিত বেঙ্গলে যে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছিল সেটা একেবারেই বিস্মৃত হয়ে পড়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বর্ণনা করেছেন সে সময় শকুন ও কুকুরে খাওয়া মরদেহ জমিতে ও নদীর ধারে পড়ে থাকার কথা। এতো মৃতদেহের সৎকার করার ক্ষমতাও কারো ছিল না। গ্রামে যাদের মৃত্যু হয়নি তারা খাদ্যের সন্ধানে শহরাঞ্চলে চলে যান। "প্রত্যেককে কঙ্কালের মতো দেখাতো, মনে হতো শরীরের কাঠামোর ওপরে শুধু চামড়া লাগানো," বলেন প্রখ্যাত অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। দুর্ভিক্ষের সময় তার বয়স ছিল মাত্র আট বছর। "ভাত রান্নার সময় যে মাড় তৈরি হয়, লোকজন সেটার জন্য কান্নাকাটি করতো। কারণ তারা জানতো যে তাদেরকে তখন ভাত দেওয়ার মতো কেউ ছিলো না। একবার যে এই কান্না শুনেছে সে তার জীবনে কখনো এই কান্নার কথা ভুলতে পারবে না। এখনো সেসব নিয়ে কথা বলতে গেলে আমার চোখে জল চলে আসে। আমি আমার আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।" বেঙ্গলে এই দুর্ভিক্ষের সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৪২ সালের এক ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার কারণে। তবে এই পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটেছিল স্যার উইনস্টন চার্চিল ও তার মন্ত্রিসভার নীতিমালার কারণে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ইতিহাসবিদ ইয়াসমিন খান বলেছেন বার্মা থেকে জাপানিরা বেঙ্গল দখল করতে চলে আসতে পারে এই আশঙ্কায় ওই নীতি গ্রহণ করা হয়েছিলো। "এর পেছনে উদ্দেশ্য ছিল শস্যসহ সবকিছু ধ্বংস করে ফেলা, এমনকি যেসব নৌকায় শস্য বহন করা হবে সেগুলোও। ফলে জাপানিরা যখন আসবে তারা আর সেখানে টিকে থাকার জন্য সম্পদ পাবে না। এই নীতি গ্রহণের ফলে যেসব প্রভাব পড়েছিল ইতিহাসে সেগুলো ভালো করেই লেখা আছে।" ভারতীয় প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা ব্রিটিশ সৈন্যদের লেখা ডায়েরিতে দেখা যায়, উইনস্টন চার্চিলের সরকার ভারতে জরুরি খাদ্য সাহায্য পাঠানোর আবেদন কয়েক মাস ধরে বাতিল করে দিয়েছিল। এর পেছনে কারণ ছিল ব্রিটেনে খাদ্যের মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং যুদ্ধের বাইরে অন্য কাজে জাহাজ মোতায়েন করা। চার্চিল ভেবেছিলেন দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় স্থানীয় রাজনীতিকরাই অনেক কিছু করতে পারবেন। বিভিন্ন নোটে ভারতের প্রতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারেও কিছু ধারণা পাওয়া যায়।দুর্ভিক্ষের ত্রাণের বিষয়ে সরকারের এক আলোচনায় ভারত বিষয়ক সেক্রেটারি অব স্টেট লিওপোল্ড এমারি বলেছিলেন যে চার্চিল মনে করতেন, ভারতে কোন সাহায্য পাঠিয়ে লাভ হবে না কারণ "ভারতীয়রা খরগোশের মতো অনেক বাচ্চা প্রসব করে।" ইতিহাসবিদ মিস খান বলেন, "দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির জন্য আমরা তাকে কোনভাবেই দায়ী করতে পারি না। তবে আমরা এটুকু বলতে পারি যে দুর্ভিক্ষ লাঘব করার জন্য তার যখন ক্ষমতা ছিল, সেসময় তিনি কিছু করেননি।" "শ্বেতাঙ্গ ও ইউরোপীয় জীবনকে দক্ষিণ এশীয়দের জীবনের চেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য আমরা তাকে দায়ী করতে পারি। এটা সঠিক ছিল না কারণ দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় লাখ লাখ ভারতীয় সৈন্যও যুদ্ধ করেছে।" ব্রিটেনে অনেকে দাবি করেন ভারত সম্পর্কে চার্চিল ন্যাক্কারজনক মন্তব্য করলেও তিনি ভারতকে সাহায্য করতে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তাতে বিলম্ব হয়েছে। তবে তার আমলেই লাখ লাখ মানুষ মারা গেছেন অত্যন্ত মৌলিক একটি পণ্য- খাদ্যের অভাবে। ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তা এবং সেসময়ে ভারতের ভাইসরয় আর্চিবাল্ড ভ্যাবেল বেঙ্গলের দুর্ভিক্ষকে ব্রিটিশ শাসনামলের অন্যতম বড় এক বিপর্যয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, এর ফলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছিল সেটা অপরিমেয়। দুর্ভিক্ষ থেকে যারা বেঁচে গেছেন তারা এতে অতন্তু ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, "ভেতরে ভেতরে একটা আশা ছিল যে ব্রিটিশ সরকার সেসময় ভারতের প্রতি যা করা হয়েছিল তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করবে।" যুক্তরাজ্যেও অনেকে এসব বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। জুন মাসে ব্রিটেনে বর্ণবাদবিরোধী ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের সময় লন্ডনে চার্চিলের একটি মূর্তি বিকৃত করে ফেলা হয়। "আমি মূর্তি ভেঙে ফেলা বা বিকৃত করার পক্ষে নই," বলেন ভারতীয় ইতিহাসবিদ রুদ্রাংশু মুখোপাধ্যায়। "কিন্তু আমি মনে করি এসব মূর্তির নিচের দিকে ধাতব যে পাত থাকে সেখানে পূর্ণ ইতিহাস লেখা উচিত যে চার্চিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একজন বীর নায়ক ছিলেন। আবার এটাও লেখা উচিত যে ১৯৪৩ সালে বেঙ্গলে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর জন্যেও তিনি দায়ী ছিলেন।" বর্তমানের লেন্স দিয়ে অতীতের বিচার করা হলে সারা বিশ্বে হয়তো একজন বীরও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ভারতে স্বাধীনতার সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা মোহনদাস গান্ধীও অভিযুক্ত হয়েছেন তার কৃষ্ণাঙ্গবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য। তবে তাদের জীবনের সর্বাঙ্গীন সত্য স্বীকার করতে না পারলে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া কঠিন। আমার শিশুকালের আইকন এনিড ব্লাইটনও সমালোচিত হয়েছেন তার বর্ণবাদী ও যৌনবৈষম্যবাদী কাজের জন্য। এখন একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হিসেবে আমি ও আমার বোন পিতামাতার বাড়িতে যা রেখে এসেছি, সেখানে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ আছে। আমি কি এখন সেগুলো সব ছুঁড়ে ফেলে দেব? না। আমার শৈশবে তারা যে সুখস্মৃতি তৈরি করেছেন সেগুলো, আমি এখন যা জানি, তা দিয়ে নষ্ট হবে না। কিন্তু সেসব বই আমি আমার পরিবারের শিশুদের পড়তে দেব না। তাদের সেসব গল্পই পড়া দরকার যেখানে ভারসাম্যপূর্ণ এক বিশ্বের কথা বলা হয়েছে। গ্রন্থনা:অধ্যক্ষ মহসীন আলী আঙ্গুঁর ,সম্পাদক ও প্রকাশক, মুজিবনগর খবর ডট কম,মেহেরপুর।Slider
দেশ
মেহেরপুর জেলা খবর
মেহেরপুর সদর উপজেলা
গাংনী উপজেলা
মুজিবনগর উপজেলা
ফিচার
খেলা
যাবতীয়
ছবি
ফেসবুকে মুজিবনগর খবর
Home
»
lid news
»
others
» ১৯৪৩ সালে ভারতের বাংলায় দুর্ভিক্ষের ৩০ লাখ মানুষ অনাহারে মারা গেলেও ব্রিটিশরা নিরব ছিল ।
Mujibnagar Khabor's Admin
We are.., This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
Labels
- Advertisemen
- Advertisement
- Advertisementvideos
- Arts
- Education
- English News
- English News Featured
- English News lid news
- English News national
- English News news
- English Newsn
- Entertainment
- Featured
- games
- id news
- l
- l national
- li
- lid news
- lid news English News
- lid news others
- media
- national
- others
- pedia
- photos
- politics
- politics English News
- t
- videos
- w
- world
- Zilla News
জনপ্রিয় পোস্ট
-
দেশের প্রখ্যাত ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ আহ্ছানিয়া মিশন ক্যান্সার ও জেনারেল হাসপাতালের ১৫০ জন চিকিৎসক জনস্বাস্থ্য রক্ষার্থে তামাক নিয়ন...

No comments: