Sponsor



Slider

বিশ্ব

জাতীয়

রাজনীতি


খেলাধুলা

বিনোদন

ফিচার


যাবতীয় খবর

জিওগ্রাফিক্যাল

ফেসবুকে মুজিবনগর খবর

» » » শিল্প সাহিত্য ঐতিহ্যের আলোয় মেহেরপুর ।




শিল্প সাহিত্য ঐতিহ্যের আলোয় মেহেরপুর । ঊনিশ শতকের পঞ্চাশ দশকের শেষ দিকে মেহেরপুর সদর, গাংনী, তেহট্ট করিমপুর, চাপড়া নিয়ে গঠিত মহকুমার প্রশাসনিক সদর হিসেবে স্বীকৃতি পায় মেহেরপুর। এই স্বীকৃতি লাভের মধ্য দিয়ে মেহেরপুরের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি, রাস্তাঘাট, দালানকোঠা, ব্যবসায়-বাণিজ্যের ওপর পড়তে থাকে শহরের ছাপ। ১৮৬৯ সালে মিউনিসিপ্যালিটি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে

‘মেহেরপুর’ নামক বর্ধিষ্ণু গ্রাম পরিণত হয় মফস্বল শহরে। এরপর একে একে গড়ে ওঠে সরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিপণী বিতান, ইমারাত, উপাসনালয় ইত্যাদি। ঊনিশ শতকের মেহেরপুর শাসিত হত মুখার্জি ও মল্লিক জমিদারদের দ্বারা। মুখার্জি বংশের জমিদারদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন দীননাথ মুখোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন প্রজাবৎসল, সদাশয় ও সঙ্গীতানুরাগী। এ বংশের সবচেয়ে খ্যাতিমান ছিলেন মথুরানাথ মুখোপাধ্যায়। তাঁর সময়ে জাঁকজমকের সাথে দুর্গোৎসব উদযাপিত হত। এ উপলক্ষে বারোয়ারি তলায় বসতো যাত্রা আর কবিগানের আসর। পূজার জাঁকজমক দেখে কবিগানের আসরে এক কবিয়াল গেয়েছেন, ‘সত্যযুগে সুরথ রাজা।/ করেছিলেন দেবীর পূজা।/ ত্রেতা যুগে রাম।/ কলিযুগে মথুরানাথে/সদয হলে ভবানী,/হায় কী, পূজার ঘটা/মেহেরপুরে মহিষামর্দ্দিনী।’ মুখার্জি জমিদাররা যাত্রা, বিয়েটার ও কবিগানের সমঝদার ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সে সময়ের যাত্রাভিনেতা হিসেবে নামকরা ছিলেন কানাইলাল সরকার, পাঁচু হালদার, নিখিল বাড়–য়া প্রমুখ। মুখার্জি জমিদারের মত মল্লিক জমিদারদেরও প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল। তারাও শিল্প সহিত্য, গান বাজনার সবিশেষ অনুরাগী ছিলেন। মল্লিক পরিবারের রমনী মোহন মল্লিক ছিলেন বৈষ্ণব সাহিত্যে প-িত। ‘চ-ীদাস’, ‘জ্ঞানদাস’, ‘বলরাম দাস’ প্রভৃতি গ্রন্থ তিনি টিকাসহ সম্পাদনা করেন। আর শ্রীকৃষ্ণ মল্লিক ছিলেন আমোদ প্রিয়, মজলিসি স্বভাবের মানুষ। তাঁর উদযোগে গড় পুকুর প্রাঙ্গণে মহাসমারোহে বসতো বাসন্তী মেলা। এই মেলা প্রাঙ্গণের ম-প সাজাতে আসতো কৃষ্ণনগরের খ্যাতিমান শিল্পীরা। কলকাতা থেকে আসতো থিয়েটারের দল; আমোদ প্রমোদের জন্য ব্যবস্থা করা হতো খেমটা নাচ, নাগরদোলা এবং ঘোড়াদৌড়। দীনেন্দ্রকুমার রায় ‘সেকালের স্মৃতি’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘সেকালে মেহেরপুরে সাধারণ গৃহস্থদের অনেকে দুর্গোৎসব, জগদ্ধীত্রী পূজা করিত; কালী পূজা, কার্তিক পূজা তো ঘরে ঘরে লেগেই থাকতো। সরস্বতী পূজা উপলক্ষে কালী বাজারে সপ্তাহ ব্যাপী জনসাধারণ দিবারাত্রি সেই উৎসবে মত্ত থাকতো; জমাষ্টমীতে বৌবাজারে কত আমোদ, গ্রাম্য শ্রমজীবীরা ময়ুরপক্সক্ষীতে উঠিয়া সাধুগানে গ্রামের পক্ষ প্রতিধ্বনিত করিয়া প্রদক্ষিণ করতো।’ সে সময় সারা বছর গ্রামে গ্রামে উৎসব লেগেই থাকতো। মানুষে মানুষে বিরোধ ছিল না। হিন্দু মুসলমানের মধ্যে আচার আচরণগত পার্থক্য থাকলেও সাম্প্রদায়িক সংঘাত ছিল না। ঊনিশ শতকের সেই সোহার্দ্য সম্প্রীতি মুখর, আনন্দময় মেহেরপুর আর নেই। কালের গতিতে ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি, আচার আচরণ বদলে যায়, মেহেরপুরও তেমনি বদলেছে পরিবর্তিত হয়েছে। পরিবর্তনের হাওয়ায় তার অন্তর্জীবন, বহির্জীবন দুই ওলট পালট হয়ে গেছে। আর এই পরিবর্তনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে রাজনীতি। একথা জোর দিয়েই বোধ হয় বলা যায়, রাজনীতি সব পারে; সব পেরেছে চির বন্ধুদের মধ্যে এনে দিতে পারে যুদ্ধের তা-ব, শত্রুদের মাঝে সৃষ্টি করতে পারে সখ্য সম্পর্ক। এই রাজনীতিই দীননাথ মুখার্জি, শ্রীকৃষ্ণ মল্লিক এর উত্তর পুরুষদের ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য করেছে; ভেদ সৃষ্টি করেছে হিন্দু মুসলমানে। আবার এই রাজনীতিই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে হিন্দু মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। রাজনীতি কেবল ভূখ-কে ভাগ করে না, ভাগ ও বিধ্বস্ত করতে পারে ভাষা-সাহিত্য, সমাজ, সভ্যতাকে। সাতচল্লিশের বিভাজন এবং পরবর্তী রাজনীতির বৈরী প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবেশ মেহেরপুরকে ও তার কয়েকশত বছরের গৌরবময় ঐতিহ্যকে করেছে বিধ্বস্ত ও শ্রীহীন। এ অঞ্চলের অসংখ্য গ্রাম দেশভাগ পূর্ব সময়ের করুণ স্মৃতি নিয়ে ম্লান ও পীড়িত হয়ে পড়ে আছে। মনে বারবার প্রশ্ন জাগে, কোন কারণে বল্লপুরের ভবানন্দ মজুন্দার নির্মিত শিবমন্দির, আমদহের রাজা গোয়ালা চৌধুরীর রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ নিশ্চিহ্ন হলো। কার অভিশাপে ঢপগান, অষ্টকগান, পীরকীর্তন, ঘাটু গান হারিয়ে গেল। আমাদের অতীতকে ভবিষ্যতে রূপান্তরিত করতে এবং ঐতিহ্যকে ইতিহাসে পরিণত করতে বল্লভপুর ও ভবানন্দপুরের মন্দির। বলরাম হাড়ির আখড়া, শাহ ফরিদ-শাহ ভালাই এর দরগাহ, গড়ের পাড়ের বাসন্তী মেলা, কালী বাজারের বৈশাখ সংক্রান্তির মেলা, গোয়াল গ্রামের ¯œানযাত্রার উৎসব, বারোয়ারিতলার যাত্রাপালা ও কবির লড়াই, আখড়া আশ্রমের বাউল গান, ভবরপাড়া অঞ্চলের সাহেবধনীদের গান খোঁজ রাখতেই হবে। কারণ কয়েকশত বছরের বর্ণাঢ্য ঐতিহ্যের সাথে আজকের মেহেরপুরের রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। ‘তীর সামনে ছুটে যাবার আগে কিছুটা পিছিয়ে যায়। বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবার পথে যে কোন সমাজের মাঝে মাঝে ঐতিহ্য ও ইতিহাসের দিকে ফিরে যাওয়া দরকার।’ (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, ‘প্রথম আলো’। কলকাতা, জানুয়ারি ১৯৯৬। ফ্ল্যাপকথন।) মেহেরপুরকেও সামনে এগিয়ে যেতে অনতিঅতীতের গৌরবময় ঐতিহ্যের কাছে ফিরে যেতে হবে।






«
Next
Newer Post
»
Previous
Older Post

No comments:

Leave a Reply